উজায়ের সালেহ

বন্ধুবর ওমর ফারুক বহুদিন ধরেই বলছিলো কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ ক্লান্তি, অবসাদ ও একঘেয়ে জীবনের ভেতর সামান্য মুক্ত বাতাস যেন আমিও খুঁজছিলাম, কিন্তু বরাবরই আমার সময়গুলো এমন এক শৃঙ্খল আবদ্ধের ভেতর দিয়ে কাটে, যেখানে ইচ্ছা থাকলেও নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। মানুষের ব্যক্তিজীবনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে ভেতরের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোকেও নিষ্প্রভ করে দেয়। তার সাথে ভেতরে জন্ম নেয় এক ধরনের নীরব অবসাদ, যা প্রকাশ না পেলেও ক্রমাগত ভেতর থেকে নিঃসশেষ করতে থাকে।

ঠিক সেই সময়েই ওমর ফারুকের প্রস্তাবগুলো বারবার ফিরে আসছিলো। প্রথমদিকে গুরুত্ব না দিয়ে ভাবছিলাম, এই মুহূর্তে পাহাড়, নদী কিংবা কোনো জনপদের সৌন্দর্য দেখার মতো মানসিক অবকাশ নেই। কিন্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের ক্লান্তি থেকে সম্পূর্ণ পালিয়ে থাকতে পারে না। অন্তরের গভীরে কোথাও হয়ত এক টুকরো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নীরবে জেগেই ছিলো।

অবশেষে হঠাৎ করেই একদিন সম্মতি জানিয়ে তাকে দেখা করতে বলি। বুঝতে পারলাম এটি তার জন্যও অবাকের ছিলো। তবে সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ দ্বিধা ও অস্বস্তির পর এক ধরনের আত্মসমর্পণের মতো ছিলো। মনে হচ্ছিলো, বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্লান্ত আত্মা একটু দূরে কোথাও গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে চায়। প্রতিদিনের একই দৃশ্য, একই কোলাহল এবং একই অবসন্নতার বৃত্ত থেকে সাময়িক মুক্তির প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিলো গভীরভাবে। খুব দ্রুতই প্রস্তুতি নিলাম। ঠিক হলো যাওয়া হবে রাঙামাটি।


শৈশব থেকেই রাঙামাটিকে বাংলাদেশের ভূগোলের ভেতর এক ভিন্ন স্বর হিসেবে জেনে আসছি। পাহাড়ের পর পাহাড়, মেঘের ছায়া, কাপ্তাই হ্রদের অনন্ত জলরাশি, সবুজ বনভূমি এবং বহু জাতিসত্তার দীর্ঘ ইতিহাস মিলে এ জনপদ যেন দেশের অন্যসব অঞ্চল থেকে আলাদা এক জগত। বহুদিন ধরেই রাঙামাটির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করতাম। হয়ত প্রকৃতির জন্য বা তার ইতিহাসের জন্য, যে ইতিহাসের ভেতর আছে পাহাড়ি মানুষের দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রকৃতির সাথে এক নিবিড় সহাবস্থান।

কোনো কোনো ভূখণ্ড আছে, যেগুলোকে মানুষ ভ্রমণের আগেই কল্পনায় বহুবার অতিক্রম করে ফেলে। রাঙামাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক নাম ছিলো। ছবিতে দেখা পাহাড়, মানুষের মুখে শোনা কাপ্তাইয়ের জলরাশি কিংবা মেঘে ঢেকে থাকা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, এসবের ভেতর এক ধরনের রহস্যময়তা ছিলো। মনে হতো, সেখানে গেলে হয়ত প্রকৃতির পাশাপাশি নিজের সাথেও নতুন করে পরিচয় হবে।

এছাড়াও রাঙামাটি সম্পর্কে যতটুকু জানতাম, তার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলো কাপ্তাই হ্রদের ইতিহাস। এই বিস্তীর্ণ জলরাশির নিচে ডুবে আছে বহু জনপদ, বহু স্মৃতি, বহু মানুষের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের আড়ালে ইতিহাসের এই নীরব বেদনা আমাকে প্রায় গভীরভাবে নাড়া দিতো। মনে হতো সেখানকার পাহাড়গুলোর গায়ে লেগে আছে বহু মানুষের দীর্ঘশ্বাসও। এটাও সত্য যে, একটি ভূখণ্ডকে বুঝতে হলে তার সৌন্দর্য দেখার সাথে সাথে নীরবতাকেও পড়তে জানতে হয়। কারণ আমরা যে স্থানগুলোতে বেড়াতে যাই, সেগুলো আসলে অন্য কারো জীবনভূমি। সেখানে মানুষের ইতিহাস, সংগ্রাম, বেদনা আছে, আছে টিকে থাকারও দীর্ঘ লড়াই।

পাহাড়ি জনপদগুলোর জীবনযাত্রা নিয়েও আমার এক ধরনের কৌতূহল রয়েছে। সমতলের মানুষের জীবনের সাথে তাদের জীবনের পার্থক্য আঁকতে ভৌগোলিক থেকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি এবং জীবনসংগ্রামের অধ্যায়ও আসবে অনায়াসে। পাহাড়ের মানুষ প্রতিদিন যে পথ অতিক্রম করে, তা তাদের টিকে থাকার এক দীর্ঘ বাস্তবতা। তাদের জীবনে প্রকৃতি যেমন আশ্রয়, তেমনি কখনো কখনো প্রতিকূলতাও। বর্ষার প্রবল বৃষ্টি, দুর্গম পথ, বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘ অবহেলার ভেতর দিয়েও তারা নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারাকে কীভাবে ধরে রাখে, এ বিষয়টি আমাকে সবসময় গভীরভাবে ভাবায়।

আসলে ব্যাপার হলো সভ্যতার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করা এই জনপদগুলোকে আমরা প্রায়শই কেবল পর্যটনের চোখ দিয়ে দেখি। পাহাড়কে দেখি সৌন্দর্য হিসেবে, হ্রদকে দেখে মুগ্ধ হই, কিন্তু সেখানে বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘ বাস্তবতা সম্পর্কে খুব কমই ভাবি। অথচ প্রতিটি পাহাড়ি পথের পাশে, এবং প্রতিটি নীরব গ্রামের ভেতর এমন বহু গল্প লুকিয়ে আছে, যেগুলো হয়ত কখনো উচ্চারিত হয় না। আর তাই সেখানকার মানুষের জীবন এতটাই নীরব, যে তার বেদনা কেবল ভূখণ্ডের বাতাসে ভেসে থাকে।

রাঙামাটির প্রতি আমার আকর্ষণের পেছনে সম্ভবত এ বিষয়টিও গভীরভাবে কাজ করছিলো। প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়েও সেখানের প্রতিটি স্তরের নিচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের জমাট স্তব্ধতাকে জানার আগ্রহ ছিলো প্রকট। মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক বোধহয় এটাই যে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভূখণ্ডগুলোর ভেতরেও প্রায়শই গভীর বেদনার ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। রাঙামাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক ভূখণ্ডের নাম, যেখানে পাহাড়ের সৌন্দর্য যেমন বিস্মিত করে, তেমনি তার নীরবতা মানুষকে দীর্ঘসময় ধরে ভাবিয়েও রাখে।


যেকোনো সফরের ক্ষেত্রেই নিজের ভেতর বরাবর এক ধরনের দীর্ঘ সংশয় কাজ করে। কারণ আমার কাছে সফর কখনোই কেবল স্থানান্তরের বিষয় নয়; বরং তা মানুষের স্বভাব, মানসিকতা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ারও এক গভীর পরীক্ষা। একটি সফরকে সুন্দর কিংবা বিষাদময় করে তোলার পেছনে গন্তব্যের চেয়ে সফরসঙ্গীর ভূমিকা অনেক বেশি—এ উপলব্ধি খুব অল্প বয়সেই হয়েছে। কারণ পথ মানুষের অন্তর্গত স্বরূপকেও প্রকাশ করে। দীর্ঘ যাত্রা, অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি কিংবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির ভেতর মানুষ আসলে যেমন, ঠিক তেমনিভাবেই ধরা পড়ে।

সম্ভবত এ কারণেই কোথাও যাওয়ার আগে আমাকে দীর্ঘসময় ধরে ভাবতে হয়। কোথায়, কেন যাচ্ছি, এসবের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভাবি কার সাথে যাচ্ছি। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, মূল্যবোধ এবং পথের প্রতি তার উপলব্ধি, এসব বিষয় আমার কাছে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সফরেরও একটি নিজস্ব নৈতিকতা আছে। এটি ধৈর্য, সহমর্মিতা, সংযম এবং পারস্পরিক সম্মানেরও বিষয়। পথের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পথের মানুষগুলোও অন্তত কিছুটা সুন্দর হয়।

বন্ধুবর ওমর ফারুকের ব্যাপারে আমার স্বস্তির জায়গাটি ছিলো সম্ভবত এখানেই। তার ভেতর অযথা কৃত্রিমতা নেই, পথকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখার প্রবণতাও পাইনি। দীর্ঘদিনের পরিচয়ে এটুকু বুঝেছিলাম যে, অন্তত নীরবতাকে সে অস্বস্তিকর মনে করে না। আচমকা তাকে সম্মতি দেয়ার পেছনে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো।

এখানে বন্ধুবরকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া সঙ্গত হবে। যারা সফরকে ট্যুর, ভ্রমণ কিংবা আনন্দযাত্রার আধুনিক পরিভাষায় ব্যক্ত করতে অভ্যস্ত, তাদের ভাষায় তাকে খুব সহজেই “হোস্ট” কিংবা “গাইড” বলা যায়। তবে আমার কাছে শব্দ দুটি কেমন যেন অতিরিক্ত পেশাদার এবং নিরাবেগ শোনায়। পাহাড়ের পথে, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির ভেতর কিংবা অপরিচিত জনপদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতির সাথে “গাইড” শব্দটির সম্পর্ক খুব গভীর মনে হয় না। আমার ভাষায় এ ধরনের মানুষকে বরং “রাহবার” বলতেই বেশি স্বস্তি লাগে। যে কেবল পথ দেখায় না, বরং পথের ভেতর দিয়ে মানুষকে বহনও করে নিয়ে যায়।

যদিও বিষয়টি নিয়ে ওমর ফারুককে বললে সে সম্ভবত হাসতেই শুরু করতো। কারণ বর্তমান সময়ে মানুষ যেখানে দুই দিনের সফরকেও “ট্রিপ” বলার মধ্যে আধুনিকতার পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়, সেখানে “রাহবার” শব্দটি উচ্চারণ করা অনেকের কাছেই হয়ত খানিকটা অতিরিক্ত ভাবগম্ভীর শোনাবে। কিন্তু শব্দেরও তো নিজস্ব আবহ আছে। “হোস্ট” শব্দে আয়োজনের গন্ধ পাওয়া যায়, আর “রাহবার” শব্দে পাওয়া যায় পথের গভীরতা, সহযাত্রা ও অন্তর্গত দিকনির্দেশনা। একজন মানুষকে আপনি কী নামে ডাকছেন, তার ভেতরেও আপনার দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা প্রতিফলন থেকে যায়।

তবে বাস্তবতার কথাও স্বীকার করতে হয়। পুরো সফরনামাজুড়ে বারবার “রাহবার” শব্দটি ব্যবহার করলে পাঠকের একাংশ হয়ত আমাকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সাহিত্যরসিক কিংবা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ মনে করতে পারেন। তাছাড়া আধুনিক পাঠকের সাথে তাল মিলিয়ে চলারও তো একটি অলিখিত দায় রয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই এ সফরনামার অবশিষ্ট অংশে আমার বন্ধুবরকে “হোস্ট” বলেই উল্লেখ করবো। যদিও অন্তত আমার ভেতরে শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সময়ও কোথাও না কোথাও “রাহবার”-এর আবহটুকু থেকেই যাবে।

যাত্রার দিন, তারিখ ও সময়ও নির্ধারিত হয়ে গেলো। হোস্ট আগেই একধরনের স্বাভাবিক দায়িত্ববোধ থেকে সফরের কার্যসূচী ও নীতিমালা গুছিয়ে জানিয়েছিলো। আমার কাজ ছিলো মূলত প্রস্তুত হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য নিজেকে তৈরি রাখা। যদিও বাহ্যিক প্রস্তুতির চেয়ে ভেতরের প্রস্তুতিটাই তখন বেশি অনুভব করছিলাম। মানুষ যখন বহুদিন পর কোথাও দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার ভেতরে অদ্ভুত এক দ্বৈত অনুভূতির জন্ম হয়। একদিকে যাত্রার আকর্ষণ, অন্যদিকে পরিচিত পরিসর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার এক নীরব সংশয়।

দূরে কোথাও সফরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার জীবনে একটি বিষয় বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হলো আব্বুর অনুমতি। বয়স, অভিজ্ঞতা কিংবা আত্মনির্ভরতার বিচারে হয়ত এখন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য অনুমতি নেওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। আধুনিকতা তো মানুষকে ক্রমশ এমন এক মানসিকতার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়িয়েছে পরামর্শ কিংবা অভিভাবকত্বের ঊর্ধ্বে নিজেকে কল্পনা করা। কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি কখনো সেভাবে প্রতিভাত হয়নি। কারণ বাবা-মায়ের অনুমতির সাথে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বাহিরেও জড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধা, সম্পর্কের গভীরতা এবং মানুষের ভেতরে লালিত পারিবারিক আদবের প্রশ্নও।

তবে এ সফরে তার ব্যত্যয় ঘটলো। আব্বুকে বিষয়টি সরাসরি জানানো হয়নি। এর পেছনে অবহেলা কিংবা গোপনীয়তার মানসিকতা কাজ করেনি; বরং তখনকার পরিস্থিতিই এমন ছিলো যে, তাঁকে নতুন করে দুশ্চিন্তার ভেতর ফেলতে ইচ্ছা হয়নি। বয়স ও শারীরিক ক্লান্তির সাথে মানুষের মানসিক উদ্বেগও একসময় বেড়ে যায়। দূরের সফরের কথা শুনলে তিনি অযথাই পথঘাট, নিরাপত্তা কিংবা নানা অনিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করতেন—এ বিষয়টি ভালো করেই জানতাম। আর সত্যি বলতে সফরটাও দীর্ঘ পরিকল্পিত বা অপরিহার্য ছিলো না, যার জন্য তাঁকে मानসিকভাবে ব্যস্ত করে তোলাটা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তাই একধরনের নীরব সংকোচ থেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিলো। যদিও ভেতরে ভেতরে এ অনুভূতিও ছিলো যে, কিছু সম্পর্কের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা এত গভীর হয় যে, সামান্য গোপন রাখাও একধরনের अपराधবোধ তৈরি করে।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই যে, নতুন প্রজন্ম ক্রমশ “স্বাধীনতা” আর “বিচ্ছিন্নতা”-কে এক জিনিস মনে করতে শুরু করেছে। বাবা-মায়ের পরামর্শ, কিংবা নিষেধকে অনেকেই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখে। অথচ গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, পৃথিবীতে খুব কম সম্পর্কই আছে যেখানে মানুষের মঙ্গল এত নিঃস্বার্থভাবে কামনা করা হয়। একজন মা-বাবার ভয়, সতর্কতা কিংবা বাধা অনেকসময় যুক্তির বিচারে অতিরিক্ত মনে হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার বিচারে সেগুলোর গভীরতা অসীম। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের জীবনযাত্রা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে পারিবারিক সম্পর্কের ধরনও। এখন মানুষ ঘরের ভেতর থেকেও ক্রমশ একা হয়ে যায়। প্রযুক্তি আমাদেরকে সংযুক্ত করেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িয়ে দিয়েছে।


হোস্ট ঢাকা থেকে প্রায় চল্লিশ জনের বিশাল কাফেলা নিয়ে আসছেন। এদিকে চট্টগ্রাম থেকে যুক্ত হচ্ছি কেবল আমি একাই। পুরো কাফেলার মধ্যে নিজেকে এক বিচ্ছিন্ন বিন্দু মনে হচ্ছে, যে মাঝপথ থেকে এসে একটি চলমান যাত্রার সাথে নিজেকে সংযুক্ত করবে। বিষয়টির ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিলো। বড় কোনো সফরের ক্ষেত্রে “কাফেলা” শব্দটির ভেতর সবসময়ই এক ধরনের ঐতিহাসিক আবহ অনুভব করি। মানুষের দলবদ্ধ যাত্রার মধ্যে পথচলার সাথে বহু ভিন্ন স্বভাব, ভিন্ন অভ্যাস, ভিন্ন মানসিকতার মানুষের সাময়িক সহাবস্থানের সুযোগ হয়। যা আমাদের জীবনকে নতুন অভিজ্ঞতাও শেখায় অনেক।

রাত একটার দিকে রওয়ানা হই। চট্টগ্রাম শহর তখন প্রায় নিস্তব্ধ। দিনের কোলাহল স্তিমিত হয়ে আসার পর রাতের শহরকে সবসময় আমার ভিন্নরকম লাগে। পরিচিত পথগুলোও তখন যেন অন্য এক আবহ ধারণ করে। তবে কাফেলার সাথে সরাসরি যুক্ত হতে হতে প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছিলো। মাঝখানের দীর্ঘ সময়টুকু কাটলো একজনের মেহমান হয়ে। রাতের ভোজনও সেখানেই সম্পন্ন হলো।

বাহ্যিকভাবে বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হলেও, মানুষের আতিথেয়তা আমাকে বরাবরই গভীরভাবে ভাবায়। কারণ আমাদের সমাজে মেহমানদারির সংস্কৃতি এখনো অনেকাংশে আবেগনির্ভর। মানুষ প্রায়শই অতিথির প্রকৃত প্রয়োজন, রুচি কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে নিজের আন্তরিকতাকে প্রকাশ করাকেই বড় করে দেখে। ফলে অনেক সময় অতিথির চাহিদা সম্পর্কে ধারণা না রেখেই মানুষ সর্বোচ্চ আয়োজনের চেষ্টা করতে থাকে। যেন আতিথেয়তার ভেতর এক ধরনের অলিখিত সামাজিক দায় কাজ করে, যেখানে “কম” করে ফেলা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রায়ই লক্ষ্য করি, আমাদের সমাজে মেহমানদারির ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। খোদ নিজের পরিবারেও। মানুষ আন্তরিক হতে গিয়ে প্রায়ই স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে।

অথচ প্রকৃত আতিথেয়তা সম্ভবত সেখানে, যেখানে আয়োজনের চেয়ে স্বস্তির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। একজন ক্লান্ত পথিকের জন্য সবসময় ভারী আয়োজন প্রয়োজন হয় না; অনেকসময় সামান্য আন্তরিকতা, নির্ভার পরিবেশ এবং কিছু নীরব যত্নই যথেষ্ট।

একেবারে গ্রামীণ আবহে গড়া ভুনা খিচুড়ি, ডিম, মুরগি ভুনা আর ধোঁয়া ওঠা চা। ক্ষুধার চেয়ে পরিবেশনটাই মুখ্য ছিলো। দেশীয় রান্নার সহজ সরল স্বাদ এবং আন্তরিকতার উষ্ণতায় শহুরে জীবনের বাহুল্যপূর্ণ খাদ্যসংস্কৃতির ভেতর মানুষ প্রায়ই স্বাদ হারিয়ে ফেলে, অথচ গ্রামের সাধারণ রান্নার ভেতরে এমন এক আত্মিক আবহ থাকে, যা মানুষকে অদ্ভুতভাবে আপন করে নেয়। গভীর রাতে সফরের আগে সেই গ্রামীণ ভোজন যেন পুরো যাত্রার শুরুটাকেই এক ধরনের নীরব উষ্ণতায় ভরে দিয়েছিলো।

তবে এটাও সত্য যে, এ ধরনের অস্থির মেহমানদারির ভেতরেও মানুষের হৃদয়ের এক ধরনের সরলতা লুকিয়ে থাকে। মানুষ তার সাধ্য, সামর্থ্য কিংবা পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে অতিথিকে সম্মানিত করতে চায়। হয়ত সবসময় তা পরিমিত হয় না, কিন্তু তার ভেতর আন্তরিকতার অভাবও থাকে না। আর এ বিষয়টিই আমাদের সমাজকে এখনো পুরোপুরি নিরাবেগ হতে দেয়নি।


ফজরের কিছুসময় আগে কাফেলা এসে পৌঁছালো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে আসা বাসের ভেতর যেন ক্লান্তি, নিদ্রা আর সফরের প্রাথমিক উত্তেজনা মিলে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়ে আছে। হোস্ট হাটহাজারী বাস স্টেশন মোড় থেকে আমাকে তুলে নিলেন। চলমান এক যাত্রার সাথে তখন আনুষ্ঠানিকভাবে আমিও যুক্ত হয়ে গেলাম।

কিছুদূর অগ্রসর হয়ে ফজর আদায়ের জন্য রাউজান মডেল মসজিদে কাফেলা বিরতি নেয়। ভোরের নরম আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটিকে তখন দূর থেকেই এক ধরনের প্রশান্তির প্রতীক মনে হচ্ছিলো। দীর্ঘ সফরের ভেতর মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়; বরং পথিকের জন্য সাময়িক আশ্রয়ও বটে। মানুষের জীবন যতই ব্যস্ততা, ক্লান্তি এবং ছুটে চলার ভেতর আবদ্ধ থাকুক না কেন, মসজিদে প্রবেশের পর তার ভেতরে এক ধরনের স্থিরতা জন্ম নেয়। যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল কিছুক্ষণের জন্য বাইরে থেমে থাকে।

মসজিদে প্রবেশ করার পর হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি বড় অধ্যায় মনে পড়ে যাচ্ছিলো। আমরা মনে করি এ দেশে “মডেল মসজিদ” কেবল স্থাপত্যিক প্রকল্প। বরং বাস্তবতা হলো এর পেছনে সময়, রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় কৌশল এবং সমাজের ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব, সবকিছুরই একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত গত দেড় দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একসময় যে রাজনৈতিক বলয় ধর্মীয় চেতনা, islamপন্থী শক্তি কিংবা আলেম সমাজকে অনেকাংশে সন্দেহের চোখে দেখতো, তারাই ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলো বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে ইসলামকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব নয়। এ ভূখণ্ডে ইসলামের শিকড় মসজিদ-মাদরাসার গন্ডি পেরিয়ে মানুষের সংস্কৃতি, আবেগ, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতাও একসময় তাদেরকে নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য করলো।

এরপর ধীরে ধীরে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় परिसরে ইসলামি শব্দাবলীর ব্যবহার বৃদ্ধি পেল, মাদরাসাকেন্দ্রিক কার্যক্রমে আগ্রহ দেখা গেল, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো হলো, “মদিনার সনদ”, “তাহাজ্জুদ”, “কুরআন তিলাওয়াত”, “দোয়া মাহফিল”—এ ধরনের শব্দগুলোও ক্ষমতার ভাষ্যে ক্রমশ জায়গা করে নিতে শুরু করলো। আর সেই ধারাবাহিকতার একটি বড় প্রতীক হিসেবেই সামনে এলো দেশে পাঁচ শতাধিক মডেল মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মধ্যে সবসময়ই দ্বৈত অনুভূতি কাজ করে। হোস্টকেও বিষয়টি বললাম। একদিকে মসজিদ নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও কল্যাণমূলক কাজ। মুসলিম সমাজে মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; বরং তা মানুষের আত্মিক আশ্রয়, नैतिक শিক্ষার কেন্দ্র এবং সামষ্টিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অন্যদিকে যখন রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং ধর্মীয় আবেগ এক জটিল সমীকরণের ভেতর প্রবেশ করে, তখন মানুষের মনে প্রশ্নও জন্ম নেয়—কোনটি প্রকৃত আন্তরিকতা, আর কোনটি সময়ের প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া কৌশল?

কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা সবসময় মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করে। আর বাংলাদেশে মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর ভাষাগুলোর একটি নিঃসন্দেহে ইসলাম। ফলে “মডেল মসজিদ” শব্দটি শুনলে আমার মনে স্থাপত্যের সৌন্দর্যের চেয়ে এ দেশের রাজনীতি, সমাজ এবং ধর্মীয় অনুভূতির জটিল সম্পর্কগুলোর কথাও মনে পড়ে। বিশেষত ভোরের নরম আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মসজিদের সামনে এ বিষয়গুলো আরো গভীরভাবে ভাবাচ্ছিলো। কারণ এ দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত মসজিদকে কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা হিসেবে দেখে না; বরং তা তাদের বিশ্বাস, ইতিহাস এবং অস্তিত্বের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

লক্ষ্য করলাম মসজিদটি প্রতিষ্ঠার সময়কাল খুব বেশি পুরোনো নয়। উদ্বোধনী ফলকে সময় রয়েছে—২০ আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ আগে প্রকল্প থাকলেও বাস্তবায়ন হয়েছে গত ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়কালে। উদ্বোধক হিসেবে তৎকালীন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের নাম রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর সাথে জুড়ে থাকা বিতর্কের কথাও মনে পড়ে গেলো। বিশেষত একজন আলেম এবং মুসলিম হয়েও হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক আয়োজনে উপস্থিত হওয়াকে কেন্দ্র করে যেভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন, তা সমাজের এক গভীর অসুস্থ মানসিকতার দিক প্রকাশ করেছিলো তখন।

মানুষ অনেকসময় নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে দৃঢ় রাখার অর্থ মনে করে অন্যের প্রতি সম্পূর্ণ অস্বীকার কিংবা বৈরিতা প্রদর্শন করে। অথচ ইসলামের ইতিহাস, বিশেষত নববী সীরাত গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, অমুসলিমের সাথে সামাজিক সৌজন্য, নাগরিক সহাবস্থান কিংবা মানবিক আচরণ ইসলামের পরিপন্থী কোনো বিষয় নয়। বরং ইসলামের শক্তি এখানেই যে, সে নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে শেখায়।

হোস্টকে বললাম বন্ধু! সময়ের বড় সংকটকে তুমি এখানেই মাপতে পারো। মানুষ धर्मকে যতটা অধ্যয়ন করে, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করে আবেগ ও স্লোগানের উপকরণ হিসেবে। ফলে পরিমিতিবোধ হারিয়ে যায়। একজন আলেম কোনো অমুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক অনুষ্ঠানে সৌজন্যমূলক উপস্থিতি জানালেই অনেকের কাছে তা যেন ঈমান-আকিদার প্রশ্নে পরিণত হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক সহাবস্থান এবং व्यक्तिगत আকিদা—এ তিনটি বিষয় সবসময় এক সরলরেখায় পরিচালিত হয় না। মানুষের সাথে সদাচরণ এবং নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা, এ দুটি একে অপরের বিপরীত বিষয়ও নয়।

হোস্ট তার সরলতার সাথে প্রয়োজনীয় বুঝটুকু অবলম্বন করে আমাকে সায় দিলেন। ভাবলাম, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি সম্ভবত এটাই যে, মানুষ এখন মতের আগে মানুষকে বিচার করে না; বরং পরিচয়ের আগে অবস্থানকে বিচার করে। ফলে কোনো ব্যক্তিকে বোঝার চেষ্টা করার চেয়ে তাকে দ্রুত কোনো পক্ষ, কোনো ঘরানা কিংবা কোনো অভিযোগের ভেতরে আবদ্ধ করে ফেলাটাই যেন সহজ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে আমাদের ধৈর্য কমেছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া বেড়েছে বহুগুণ। পড়ার চেয়ে বেশি শুনি, বোঝার চেয়ে বেশি রায় দেই। বাস্তবতা হলো, আমরা অনেকসময় ধর্মের বাহ্যিক চিহ্নগুলোকে যতটা ধারণ করি, তার অন্তর্নিহিত আদব ও প্রজ্ঞাকে ততটা ধারণ করতে পারি না।

উদ্বোধনী ফলকটির দিকে আবার চোখ গেলো। নাম, पदবি, সময়কাল, সবকিছু কতো সুন্দরভাবে উৎকীর্ণ করা। সমাজে এখন এর প্রচলন ব্যাপক। প্রায় প্রতিটি কাজের সাথেই ব্যক্তিনামকে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার এইযে এক অদ্ভুত প্রবণতা জন্ম নিচ্ছে, যেন কোনো স্থাপনা নির্মাণের পর তার গায়ে মানুষের নাম খোদাই না হলে কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অথচ উচিত তো ছিলো, নামের চেয়ে কাজের উপকারিতাই বেশি দৃশ্যমান হওয়া। বিশেষত একটি মসজিদের ক্ষেত্রে, যেখানে মানুষের পরিচয় শেষ পর্যন্ত মুছে গিয়ে কেবল বান্দা ও রবের সম্পর্কটিই অবশিষ্ট থাকার কথা। মূলত ইবাদতের স্থানগুলো যত কম ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে, ততই তার ভেতরের আধ্যাত্মিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কারণ মসজিদ বাস্তবিক অর্থেই আত্মসমর্পণের স্থান। এখানে মানুষের নাম যত বড় হয়ে ওঠে, ইখলাসের নীরব সৌন্দর্য ততটাই আড়াল হয়ে যায়।


নামাজ শেষে আমাদের কাফেলা আবার পথ ধরলো। ভোরের আভা এখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ধীরে ধীরে যেন বদলে যেতে লাগলো চারপাশের ভূগোল। সমতলের দীর্ঘ সোজা পথ একসময় হারিয়ে গেলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তাগুলোর ভেতরে। পাহাড়ের বুক চিরে নির্মিত সরু পথ ধরে এগিয়ে চলেছি। এক পাশে উঁচু সবুজ পাহাড়, অন্য পাশে গভীর ঢাল নেমে গেছে নিচের দিকে। কোথাও ঘন গাছের সারি পথের উপর ছায়া ফেলে রেখেছে, কোথাও আবার দূরের পাহাড়গুলো স্তরে স্তরে দাঁড়িয়ে আছে নীলাভ আবছায়ায়। যেন প্রকৃতিই এখানে নিজের ভাষায় ভূগোল লিখেছে।

উপলব্ধি করলাম, পাহাড়ি পথগুলোর ভেতর এক ধরনের নীরব গাম্ভীর্য আছে। অন্তত নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করায়। পাহাড়ের বিশালতা, গভীর সবুজ আর আকাশের নিচে তার স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা, এসবের সামনে নিজেকে অনেক ছোট মনে হয় অনায়াসেই। বাসের জানালার পাশে বসে দীর্ঘসময় চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পৃথিবীর সৌন্দর্য আসলে শব্দের চেয়ে অনেক বেশি নীরবতার ভেতরেই বাস করে।

তবে এ সৌন্দর্যের ভেতরেও এক ধরনের ভয়াবহতা রয়েছে। পাহাড়ি রাস্তাগুলো যতটা মুগ্ধতার, ততটাই ঝুঁকির। হোস্টও বললো, প্রকৃতি যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়ানক। সরু বাঁক, গভীর খাদ, ভাঙাচোরা অংশ এবং পাহাড়ধসের সম্ভাবনা, সব মিলিয়ে পথগুলো অনেকসময় মানুষের অসহায়তাকে খুব স্পষ্ট করে দেয়। সামান্য অসতর্কতাও এখানে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষত বর্ষাকালে এ পথগুলোর অবস্থা আরো বিপজ্জনক। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এসব পাহাড়ি সড়কগুলোকে আরো নিরাপদ, ও পরিকল্পিত করে তোলার বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু পর্যটনের জন্য নয়, বরং এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বার্থেও। কারণ পাহাড়ি জনপদের মানুষ প্রতিদিন যে পথ অতিক্রম করে, তা তাদের কাছে জীবন ও জীবিকার অপরিহার্য বাস্তবতা।

লক্ষ্য করলাম, এত বিশাল সৌন্দর্যের মাঝখানে থেকেও অনেকে যেন প্রকৃতিকে সত্যিকার অর্থেই দেখতে আসেনি। বাসের ভেতর কেউ ব্যস্ত অবিরাম কথোপকথনে, কেউ মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে, কেউ কেবল ছবির জন্য দৃশ্য খুঁজছে। অথচ জানালার ওপাশে যে অপার সৃষ্টি বিস্তৃত হয়ে আছে, তার সামনে অন্তত কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো। আধুনিক মানুষ ধীরে ধীরে সৌন্দর্য উপভোগ করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলছে। সে প্রকৃতির কাছে যায়, কিন্তু প্রকৃতির ভেতরে প্রবেশ করে না; পাহাড় দেখে, কিন্তু পাহাড়ের নীরবতা অনুভব করে না। সৃষ্টির সৌন্দর্য আমাদেরকে আনন্দের পাশাপাশি বিনয়ও শেখায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রকৃতিকে দেখি কম, দেখাই বেশি। আর তাই হয়ত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর সামনেও মানুষের হৃদয় অনেকসময় আগের মতো কাঁপে না।

পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ করেই ভেতরে এক অদ্ভুত চিন্তার জন্ম হচ্ছিলো। আচ্ছা! এইযে একেকটি পাহাড়, একেকটি নদী, একেকটি সমুদ্র, এগুলোর বয়সই বা কতো! কত সহস্র বছর ধরে তারা এ পৃথিবীর বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছে! মানুষের সভ্যতা বদলেছে, রাজ্য বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে আবার ধ্বংস হয়েছে; কিন্তু পাহাড়গুলো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রের ঢেউ একইভাবে তীর ছুঁয়ে ফিরে গেছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! মানুষ নিজের সময়কে খুব বড় মনে করে, অথচ প্রকৃতির কাছে মানুষের পুরো ইতিহাসই যেন ক্ষণিকের একটি দৃশ্যমাত্র।

বলতে গেলে পৃথিবীর প্রতিটি পাহাড় আসলে একেকটি নীরব ইতিহাসগ্রন্থ। তারা মানুষের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে থাকে। কত যুদ্ধ, কত রক্তপাত, কত বিজয়-পরাজয়, সাম্রাজ্যের পতন, সবকিছু তারা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখেছে। মানুষের আবেগ, ক্রোধ, লোভ কিংবা ক্ষমতার উন্মত্ততা শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই; কিন্তু পাহাড়গুলো এখনো একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা নিজেদেরকে স্থায়ী মনে করে যুদ্ধ করি, অথচ প্রকৃতি খুব নীরবে দেখে যায় সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী।

আন্দালুসের পতনের কথাই ধরা যাক, কত গৌরব, কত জ্ঞান, কত সভ্যতা একসময় সেখানে বিকশিত হয়েছিলো! অথচ আজ গ্রানাডার প্রাসাদগুলোর দেয়াল, পাহাড় আর নদী ছাড়া সেই ইতিহাসের কতটুকুই বা অবশিষ্ট আছে! হয়ত সেখানকার পাহাড়গুলো এখনো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো মুসলিম স্পেনের শেষ দিনের কান্নার সময়ও। মানুষ বদলে গেছে, পতাকা বদলে গেছে, কিন্তু পাহাড়ের নীরবতা বদলায়নি।

ওদিকে আছে সালাহউদ্দিন আইয়ূবীর জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ইতিহাসের কথা। কত সৈন্য, কত যুদ্ধ, কত রক্ত আর কত স্বপ্নের মধ্য দিয়ে সেই বিজয় এসেছিলো! অথচ জেরুজালেমের চারপাশের পাহাড়গুলো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখেছে মানুষের তাকবীর, আবার মানুষের হত্যাযজ্ঞও। সত্যিই, মানুষের আবেগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রকৃতি তার নীরব স্মৃতিকে দীর্ঘকাল বহন করে।

চেঙ্গিস খানের আক্রমণের ইতিহাস তো আরো করুন। কত নগর জ্বলে ছাই হয়ে গিয়েছিলো, কত নদীর পানি রক্তে লাল হয়েছিলো! একসময় যে নগর জ্ঞান, সভ্যতা ও প্রজ্ঞার কেন্দ্র ছিলো, চেঙ্গিসীয় তাণ্ডবের ধারাবাহিকতায় সেই বাগদাদই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। বাইতুল হিকমাহর মতো বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থাগার ধ্বংস করা হয়; চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা ও নানা শাস্ত্রের অগণিত মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। টাইগ্রিস নদীতে এত বই ফেলা হয়েছিলো যে, বইয়ের কালিতে নদীর পানি কালো হয়ে উঠেছিলো। কী ভয়াবহ ব্যাপার! মানুষের জ্ঞানচর্চা, সভ্যতা ও শতাব্দীর সাধনা মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে, অথচ নদী তখনও নিশ্চুপ বয়ে চলেছে ইতিহাসের এক নীরব, নির্লিপ্ত সাক্ষী হয়ে। ইতিহাসের ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়েও সে প্রবাহিত হয়েছে নিজের নিয়মে। মানুষের নির্মমতা পৃথিবীকে ক্ষতবিক্ষত করলেও প্রকৃতি সবকিছুকে নিজের গভীর নীরবতার ভেতর ধারণ করে রেখেছে।

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে তাই মনে হচ্ছিলো, আমরা আসলে নিজের সময়ের ভেতর খুব ছোট একটি সত্তা। যে ঘটনাগুলোকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য মনে করি, প্রকৃতির কাছে সেগুলো হয়ত সময়ের প্রবাহে ক্ষণিকের তরঙ্গমাত্র। অথচ মানুষ সেই ক্ষণস্থায়ী অহংকার নিয়েই যুদ্ধ করে, সীমান্ত টানে, রক্ত ঝরায়, আবার একদিন নিঃশব্দে হারিয়েও যায়। পাহাড় তখনো দাঁড়িয়ে থাকে। সমুদ্র তখনো গর্জন করে। নদী তখনো বয়ে চলে। যেন তারা খুব নীরবে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, স্থায়ী কেবল স্রষ্টা, বাকিসবই সময়ের ভেতর বিলীন হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ক্ষণস্থায়ী ছায়ামাত্র।