ভূমিকা:
বস্তুত ফুল নিজের জন্য ফোটে না, ফোটে অন্যের জন্য। অপরের কল্যাণে বড় বড় বৃক্ষও নিজে রোদে পুড়ে অপরকে ছায়া দেয়। তার কাছে শত শত মুসাফির আশ্রয় পায়, উপকার পায়। শান্তি পায় তার শীতল ছায়ায়। ঠিক তদ্রূপ আল্লাহ তাআলা সর্বকালে এমন কতক বিশেষ মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করেন, যাঁরা ফুলের মতো ফুটে অপরের উপকার করেন। বৃক্ষের মতো অন্যকে ছায়া দেন, আশ্রয় দেন। এমনই এক আত্মত্যাগী পরোপকারী আদর্শবান প্রথিতযশা হাদীস বিশারদ হযরতুল আল্লাম মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী হাফি.। তাঁর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, তীক্ষ্ণতা দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ আলোকবর্তিকা। পথ হারা মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এমন এক ন্যায়নিষ্ঠ আদর্শবান বিপ্লবী মহাপুরুষের জীবন-আদর্শ জানা জরুরী বলে আমি মনে করি। তাই হযরতের বর্ণাঢ্য জীবনী থেকে কিঞ্চিত আলোচনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি।
১. নাম, পরিবার ও বংশ পরিচয়:
নাম: মোঃ শফিউল্লাহ, কুনিয়ত: আবু লাবীব, নিসবত: মাহমূদী (তাঁর বোখারীর শায়েখ, শায়েখে যাত্রাবাড়ী আল্লামা মুফতি মাহমুদ হাসান হাফি.-এর দিকে নিসবত করেই তাকে ‘মাহমুদী’ বলা হয়।) তবে তিনি নিজ কর্মস্থল তথা নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসায় ‘বি-বাড়িয়া হুজুর’ নামে প্রসিদ্ধ এবং তার নিজ এলাকায় ‘মুফতি সাহেব’ ও ‘মুহাদ্দিস সাহেব’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। তার পিতার নাম: মরহুম মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী (মাস্টার) রহ.। দাদার নাম: জনাব আলী। পর দাদার নাম: ছেলামত। নানার নাম: রিয়ন উদ্দীন । নানুর নাম: জুবাইদা খাতুন।
তাঁর পিতামহ ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু, সুশিক্ষিত ও সর্বজনশ্রদ্ধাভাজন একজন ব্যক্তি। তিনি ছিলেন স্থানীয় এক স্কুলের হেডমাস্টার এবং নিজ গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের অনন্য অফাদার ক্যাশিয়ার। সেই সাথে তিনি ছিলেন একজন নিত্যব্যয়ী, পরহেজগার ও দাওয়াত-তাবলীগসহ সমস্ত দ্বীনী কাজে অক্লান্ত পরিশ্রমী কর্মবীর মুজাহিদ। তিনি ছিলেন তৎকালীন সেই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব পীরে কামেল আল্লামা আব্দুর রহমান দিঘলবাগী হুজুর রহ.-এর অত্যন্ত কাছের মুরিদ ও সাচ্ছা আশেক।
তিনি স্কুলের মাস্টার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ছেলে-মেয়েদেরকে মাদরাসায় পড়িয়ে দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাঁকে অনেক সময় তাঁর স্কুলের কলিগ ও বন্ধু-বান্ধবরা বলতেন, সবাইকে মাদরাসায় কেন পড়াচ্ছেন? অন্তত একজন ছেলেকে হলেও স্কুল-কলেজে পড়িয়ে সরকারি চাকরি নেওয়ার ব্যবস্থা করে যান, না হয় পরে আফসোস করবেন। তিনি তাদের প্রতিউত্তরে বলতেন, আমি চাই না আমার কোন ছেলে জাহান্নামে যাক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ তাদের সম্মান ও রিজিকের ব্যবস্থা যথাযথ করবেন এবং তাদেরকে সুখেই রাখবেন। দ্বীনের পথে চললে আল্লাহ কাউকে অভুক্ত ও অসম্মানে রাখে না। সম্ভবত পিতামহের এই দৃঢ় বিশ্বাস ও দোয়ার ফসলেই আল্লাহ তাআলা মরহুমের ছেলে-মেয়ে ও মেয়ের জামাতাসহ নাতি-পুতি সবাইকে আজ আল্লাহ অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে রেখেছেন। তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে এ কথা লোকমুখে শোনা যায় যে, তাঁর পূর্ব পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে বর্তমান জায়গায় ইকামত করেন।
তাঁর মাতার নাম আলহাজ্বা অনুফা বেগম। আলহামদুলিল্লাহ মাতামহ এখনও বেঁচে আছেন। তিনি হলেন চাতলপাড় কচুয়া গ্রামের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত্য পরিবারের নেককার মেয়ে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে একজন খুবই খোদাভীরু, খোশমেজাজি, এবাদতকারীনি ও সতীরমণী। হযরতের পরিবারে মোট পাঁচ ভাই ও চার বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তাঁর ভাই-বোনদের মধ্যে সবাই অত্যন্ত দ্বীনদার ও আহলে ইলম।
২. জন্ম, শৈশব ও বাল্যকাল:
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর থানাধীন চাতলপাড় ইউনিয়নের অন্তর্গত বড়নগর গ্রামের মৌলভীবাড়ী মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত দ্বীনি পরিবারে ১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ ঈ. সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৬/৭ বছর, তখন পিতাকে হারিয়ে তিনি এতিম হিসেবে জীবন সংগ্রাম শুরু করেন। বাল্যকাল হতেই তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল, ভদ্র, কোমল হৃদয়, সত্যবাদী, চিন্তাশীল ও সৎ চরিত্রবান ছিলেন। পিতামহের ইন্তেকালের পর তাঁর প্রতিপালনের দায়িত্ব পড়ে মমতাময়ী মা এবং শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের উপর। মাতার আন্তরিক দোয়া এবং বড় ভাইয়ের ঐকান্তিক চেষ্টা ও মেহনতের ফলে তিনি সফলভাবে পড়ালেখা করতে সক্ষম হন।
৩. শিক্ষাজীবন:
ক. পবিত্র কুরআন ও প্রাথমিক শিক্ষা:
বাল্য বয়সে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হওয়ার পর তাকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। তবে পরিবারের সবাই পরকালমুখী ও ইসলামিক মাইন্ডের হওয়ার কারণে তিনি জেনারেল শিক্ষার প্রতি তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাই তিনি প্রথম শ্রেণী শেষ করার পর স্কুলে আর পড়াশোনা করেননি। আর তিনি কোরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে তার নিজ গ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদ ভিত্তিক মক্তবের তৎকালীন দুজন দরদী শিক্ষকের কাছে কিছু দোয়া-কালাম ও আরবী বর্ণমালার প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন। তারা হলেন, মাওলানা রফিকুল ইসলাম (শায়েখজী হুজুর) দা.বা. ও ক্বারী সৈয়দ তাফসীরুল হক এনামী দা.বা.।
অতঃপর ১৯৯৫ সালে তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মাওলানা উবায়দুল্লাহ আলবাকী হাফি. যখন পড়াশোনা শেষ করার পর কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হোসেনপুর থানাধীন শাহেদল গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘আল জামিয়াতুল কাদিরিয়া ও শাহেদল এতিমখানা মাদরাসায়’ একমাত্র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তখন তাঁর ভাই তাকে সাথে করে নিয়ে সেই নূরানী মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। আর সেই প্রতিষ্ঠানে তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের হাতেই নূরানী পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গ কোরআন শরীফ এবং মাসনুন দোয়া-দরুদ ইত্যাদি প্রাথমিক ইলম শিক্ষা লাভ করেন। নুরানী শেষ করে হিফজুল কোরআন বিভাগে ভর্তি হয়ে বেশ কিছু দিন পড়াশোনা করেন।
খ. কিতাব খানায় পড়াশোনা ও কৃতিত্ব অর্জন:
নুরানী শেষ করে এবং হিফজুল কোরআনে কিছু দিন সময় দেওয়ার পর ১৯৯৮ সালে শরয়ী ইলম হাসিলের জন্য দেওবন্দী সিলেবাসে কওমি মাদরাসায় নিয়মতান্ত্রিক কিতাবাদী অধ্যয়ন শুরু করেন। কিতাবাদী অধ্যয়নেরও শুভ সূচনা হয় তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের হাতেই। তার শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের নিয়ম ছিলো ছাত্রদেরকে এক বছরে নূরানী পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গ কোরআন শরীফ বিশুদ্ধভাবে শেখানোর পর ‘কিতাব খানায়’ কিংবা ‘হিফজখানায়’ ভর্তি করে দিতেন। তিনিই সর্বপ্রথম এই প্রতিষ্ঠানে ‘হিফজুল কোরআন বিভাগ’ ও ‘কিতাব বিভাগ’ নামে পৃথক দুটি নতুন বিভাগ চালু করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর বড় ভাই তাঁকে প্রথমে হিফজখানায় ভর্তি করান। অতঃপর কিতাবখানায় ভর্তি করান। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি ইবতেদাইয়্যাহ তথা উর্দু জামাত কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন।
১৯৯৯ সালে তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাই যখন তাঁর প্রিয় উস্তাদদের অনুরোধে নিজ গ্রামের অদুরে অবস্থিত ‘কচুয়া জামিয়া কাদেরিয়া মফিজিয়া মাদরাসায়’ চলে আসেন এবং শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হোন, তখন তিনি এখানে ‘তাইসীর জামাতে’ ভর্তি হোন। ‘তাইসীর জামাত’ থেকে ‘শরহে জামী’ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা করেন। হযরত প্রত্যেক জামাতেই ফার্স্টবয় ছাত্র ছিলেন। আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ড ‘এদারায়ে তালিমিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া’-এর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ২০০২ ঈ.সনে ‘হেদায়াতুন্নাহু’ জামাতে ৮ নম্বর বৃত্তি লাভ করেন। এবং ২০০৪ ঈ.সনে ‘শরহে জামী’ জামাতে ৪ নম্বর বৃত্তি লাভ করেন।
এরপর ২০০৫ ঈ. সনে ঢাকা ‘জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী’ মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে দীর্ঘ চার বছর সুনামের সাথে পড়াশোনা করেন এবং ২০০৮ ঈ. সনে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। তিনি হেদায়া-জালালাইন জামাত থেকেই উস্তাদের সামনে কিতাবের ইবারত পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন। মেশকাত জামাতেও বহু ইবারত পড়েছেন। বিশেষ করে দাওরায়ে হাদীসের বছর সেই জামাতের প্রায় সমস্ত কিতাবের ইবারত পড়েছেন। এমনকি বছরের শেষ দিকে এক বৈঠকে বুখারী শরীফ দ্বিতীয় খন্ডের কখনো ৪০ পৃষ্ঠা, কখনো ৪৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ইবারত পড়েছেন।
গ. উচ্চশিক্ষা:
১. ফুনূনাত:
তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে অনেক শাস্ত্রজ্ঞ শিক্ষকের নিকট ফুনূনাতের জ্ঞান লাভ করেন।
২. আরবী ভাষা ও সাহিত্য:
তিনি যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা থেকে ২০০৮ সালে ফারেগ হওয়ার পর ২০০৯ সালে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানীনগর মাদরাসার ‘উচ্চতর আরবী সাহিত্য বিভাগে’ ভর্তি হয়ে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করেন। তাঁর লিখিত আরবী প্রবন্ধ বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠালে প্রকাশিতও হয়। সেখানে তখনকার আদব বিভাগের প্রধান ছিলেন দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন ও প্রথিতযশা আদিব আল্লামা সফিউল্লাহ ফুয়াদ হাফি.। ফুয়াদ সাহেব তাঁর মেধা-বুদ্ধি, তীক্ষ্ণতা, আগ্রহ ও প্রতিভা দেখে বিশেষ স্নেহ করতেন এবং ভালোবাসতেন।
একবার ফুয়াদ সাহেব উদ্যোগ নিলেন, ‘আরবী আদব বিভাগ’-এর শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে মাদসার সকল শিক্ষক ও ছাত্রদের উপস্থিতিতে মাদরাসার মিলনায়তানে ঝাঁকজমকপূর্ণ একটি ‘আরবী অনুষ্ঠান’ উপহার দিবেন। সবাইকে পুরো দমে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন। সবাই প্রস্তুত, কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অনুষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে। কে এই ইলমী অনুষ্ঠানটি আরবীতে পরিচালনা করবে। কেউ তেমন একটা রাজি হচ্ছিল না। পরিশেষে আদিব সাহেব সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন যে, এই পুরো আরবী অনুষ্ঠানটি শফিউল্লাহ মাহমুদী [বি-বাড়িয়া] পরিচালনা করবে। কারণ তাঁর আরবী স্বর, উচ্চারণ, বলার স্টাইল ও ভাব-ভঙ্গিমা ছিল প্রায় আরবদের মত। তো তিনি তার উস্তাদের নির্দেশে পুরো অনুষ্ঠান আরবীতে পরিচালনা করে অনেক সুনাম অর্জন করেন। তা ছাড়া তাঁর আরবী লাহযাহ (স্বর ও উচ্চারণ) সুন্দর হওয়ার ফলে ফুয়াদ সাহেব ক্লাসে মাঝে-মধ্যে তাঁকে এবারত পড়তে বলতেন। এমনিইভাবে অনেক ছাত্ররা তাঁর থেকে আরবী স্টাইল ও স্বর শিখার জন্য তাঁর আরবী খুৎবা রেকর্ড করতো এবং তাঁর অনুকরণ করে আরবী শিখতো।
আরেক বারের ঘটনা, মাদানীনগর মাদরাসায় তখনখার সময়ে নাহুমীর জামাতে الطريق إلى العربية পড়াতেন, মাদরাসার সিনিয়র মুফতি ও মুহাদ্দিস ‘মুফতি নূর মোহাম্মদ কিশোরগঞ্জী’ হুজুর হাফি.। তিনি প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পর সফিউল্লাহ ফুয়াদ সাহেবকে বললেন, আপনার আদব বিভাগ থেকে একজন ভালো ছাত্র দেন, যে আমার ছাত্রদেরকে বিশুদ্ধভাবে আরবদের লাহজাহ (স্বর) অনুসারে উচ্চারণ শেখাবে। তখন ফুয়াদ সাহেব তাঁকে বললেন, তুমি আজ থেকে প্রত্যেকদিন এশারের পর নাহুমিরের ছাত্রদেরকে আধা ঘন্টা করে আরবী উচ্চারণ শেখাবে। আলহামদুলিল্লাহ তিনি এখানেও অত্যন্ত সুনামের সাথে এই দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য লাভ করেন।
৩. উচ্চতর হাদীস গবেষণা:
তিনি ২০১০ সালে ‘উলূমুল হাদীস বিভাগ’ এ ভর্তি হোন। প্রথম দিকে তিনি ঢাকা বসুন্ধরা মাদরাসায় উলূমুল হাদীস বিভাগে ভর্তি সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর তালিমে মুরুব্বির পরামর্শ ও সিদ্ধান্তক্রমে চট্টগ্রাম নানুপুর মাদ্রাসার উলুমে হাদীস বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই পূর্ণ দুই বছর হাদীস গবেষণার কাজ সমাপ্ত করেন। তাঁর এই গবেষণাকালে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি প্রত্যেক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১/২ হতেন। দুই বছরে দুই হাজার হাদীস মুখস্থ করেছেন। করেছেন বহু গবেষণা ও লেখালেখির কাজও। তিনি সেরেফ প্রথম বর্ষেই প্রধান মুশরিফের তত্ত্বাবধানে তিন তিনটি গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ লিখেছেন। যেমন-
١- هل الجرح غيبة مُحرَّمة؟
٢- البيان والتعريف في كتابة الحديث الشريف
٣- المنار السبيل في حجية الأحاديث المراسيل
এছাড়াও আরো অনেক কাজ করেছেন। বহু হাদীস তাখরীজ করেছেন। ফন্নী মাহারত অর্জন করতে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় মূলনীতি পরিপূর্ণভাবে আত্মস্থ করেছেন।
এমনিভাবে দ্বিতীয় বর্ষেও বহু ইলমী কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। এই বর্ষে তিনি প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠা ব্যাপী এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যেখানে তিনি সম্পূর্ণ জরাহ-তাদিলের মূলনীতির আলোকে এমন ৫০ জন হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত তুলে ধরেছেন, যাদের (ثقة) গ্রহণযোগ্যতা ও (ضعيف) অগ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে উলামায়ে নুক্কাদের মধ্যে বিস্তর মতানৈক্য রয়েছে। প্রবন্ধটির নাম হল,
الانتقاد في الرواة المختلفين الذين تضاربت فيهم الأقوال من الناقدين
৪. ফিকাহ ও হাদীসের সমন্বয়ে গবেষণা:
হাদীসের উপর দুই বছর পিএইচডি গবেষণা শেষ করে ২০১২ সালে পৃথকভাবে আরও এক বছর ফতোয়া ও হাদীসের সমন্বয়ে গবেষণা সম্পন্ন করেন। এই বিভাগেও তিনি আহকামের এক হাজার হাদীস মুখস্থ করেন এবং ফতোয়ার যাবতীয় মূলনীতি অধ্যয়ন করেন। ফতোয়া প্রদান ও ফতোয়া লেখার নিয়ম-কানুন আয়ত্ত করেন। ফেকাহ ও হাদীসের আলোকে অনেক ফতোয়াও তিনি লিখেন। এমনিভাবে এই বিভাগে তিনি উচ্চতর বাংলা-ইংরেজিসহ কম্পিউটারের প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করেন। এই বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ফিকহ ও হাদীসের আলোকে ‘নামাজে নাভির নিচে হাত বাঁধা’ সম্পর্কে ৩৫০ পৃষ্ঠা ব্যাপী সুদীর্ঘ একটি গবেষণালব্ধ আরবী প্রবন্ধ রচনা করেন। প্রবন্ধটির নাম হল,
الدُّرَّةُ الغُرَّة في وَضع اليَدَين تَحت السُّرَّة
পরবর্তীতে তিনি সাধারণ মানুষদের জন্য এই আরবী প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদও করেন। তাঁর অনুবাদটি এতটাই তথ্যবহুল ও গ্রহণযোগ্য ছিল যে, এটিই একমাত্র কোন ছাত্রের অনুবাদ, যেটি নানুপুর উলূমে হাদীসের কর্তৃপক্ষ সম্পাদনা করে জনসাধারণের জন্য ছাপিয়ে দিয়েছেন। আর ছাপানোর এক বছরের মাথায় প্রায় তিন হাজার কপি সেল হয়।
ঘ. শিক্ষাজীবনের সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জ:
তিনি তাঁর অধ্যয়ন জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পারি দিয়েছেন। অনেক কষ্ট, কোরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। শিক্ষাজীবনের প্রথম দিকে তিনি লজিং থেকে খাওয়া-দাওয়া করেছেন। তখনকার সময়টা ছিল মানুষের জন্য কিছুটা অভাবের জিন্দেগী। যার ফলে লজিংয়ের খানা তেমন একটা উন্নত ছিল না। এমনকি একদিন নয় দুই দিন নয় বহুদিন এমনও গিয়েছে যে, লজিং থেকে না খেয়ে আসতে হয়েছে। কারণ এখনও রান্না করা হয়নি কিংবা রান্না করতে যা যা প্রয়োজন তা আজও বন্দোবস্ত হয়নি। অনেকদিন এমনও হয়েছে যে, শুধু একবেলা পান্তা ভাত খেয়ে পুরো দিন পারি দিতে হয়েছে। আবার এমনও হয়েছে যে, সকাল বেলার খানার ব্যবস্থা হলেও দুপুরের জন্য কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় খালি বাটি নিয়ে মাদরাসায় আসতে হয়েছে। কোন কোন সময় এমন নিদারুণ অবস্থা দেখে পাশের বাড়ির মানুষজন তাঁকে খাওয়ায়ে দিতেন। তবে তিনি অধিক লজ্জাশীল হওয়ায় অনেক সময় তাদের আহবানে তেমন একটা সাড়া দিতেন না এবং না খাওয়ার বিষয়টি বুঝতেও দিতেন না।
আসলে তাঁর লজিং বাড়ির মানুষদের আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না। তাদের হৃদয়গুলো ছিল তার প্রতি ভালবাসাই পূর্ণ। বিশেষ করে লজিং মাস্টারের স্ত্রীর কথা না বললে নয়, তিনি যার পর নাই চেষ্টা করতেন যথাসময়ে খানার ব্যবস্থাপনা করে রাখতে। আল্লাহ তাদের সকলকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। তাদের শত আন্তরিকতা থাকার পরেও নানা পারিপার্শ্বিক কারণে বিভিন্ন সময় এই প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা সৃষ্টি হয়ে যেত।
এদিকে হযরতের ফ্যামিলি অত্যন্ত স্বচ্ছল ও বিত্তবান ছিল। এ ধরনের খানায় তিনি মোটেও অভ্যস্ত ছিলেন না। তথাপিও তিনি কোনদিন তার লজিং বাড়ির খাবারের বেহাল দশা নিয়ে তার ফ্যামিলির কারো কাছে অভিযোগ-অনুযোগ করেননি এবং তাঁর কোন উস্তাদের কাছেও এই মর্মে আপত্তি তুলেননি। এটায় ছিল ইলমে দ্বীন শিখার ক্ষেত্রে তাঁর ত্যাগ ও কুরবানীর অনন্য দৃষ্টান্ত।
এছাড়াও তাঁর শিক্ষাজীবনের পরতে পরতে রয়েছে বহু ত্যাগ ও কোরবানির ইতিহাস। তিনি তাঁর পুরো অধ্যয়নজীবনে নির্দিষ্ট ছুটি ব্যতীত অতিরিক্ত কোন ছুটি কাটাননি। তিনি এক ছুটি শেষ করে মাদরাসায় যেতেন, আরেক ছুটির সময় হলে বাড়িতে আসতেন। এই ছিল তাঁর শিক্ষাজীবনের রুটিন। এর ব্যত্যয় তিনি কখনো করেননি। তিনি ক্লাস মিস করে এবং পড়ালেখা বাদ দিয়ে কোনদিন কোন ভাই-বোনের বিবাহ-শাদীসহ কোন আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। এমনিভাবে তিনি সর্বদায় ছুটি শেষে মাদরাসার খোলার দিন অবশ্যই মাদরাসায় চলে যেতেন। টালবাহানা করে বাড়িতে অযথা থেকে যেতেন না।
ঙ. ছাত্রজীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা:
২০০২ সালের কথা। তিনি তখন ‘নাহবেমীর’ জামাত শেষ করে ‘হেদায়াতুন্নাহু’ জামাতে দাখেলা নেন। এই বছরটা ছিল তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথম বৃত্তি পরীক্ষা। তাঁর অত্যন্ত মুশফিক উস্তাদদ্বয় মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস (লাখাই হুজুর) দা.বা. এবং মাওলানা আমিনুল হক ইবরাহিমী (বালিখোলা হুজুর) দা. বা. তাঁকে বললেন, এবার যেকোন মূল্যে আঞ্চলিক বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তোমাকে বৃত্তি লাভ করতে হবে। এর আগে এই মাদরাসা থেকে কেউ বৃত্তি আনতে পারে নাই, তোমাকে কিন্তু বৃত্তি আনতে হবে। তখন বৃত্তি দেওয়া হত মাত্র ১০ পর্যন্ত। সে সময়ে বৃত্তি লাভ করা ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার মত কঠিন কাজ। এরপরও উস্তাদদ্বয়ের প্রেরণাদায়ক কথাগুলো শুনে তিনি পণ করলেন এবং আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে যার পর নাই মেহনত শুরু করলেন। ক্লাসের প্রতিটি কিতাবের পুরো অংশ সাওয়াল-জাওয়াব আকারে তৈরি করে আয়ত্ত করা শুরু করে দেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উস্তাদের সহযোগিতা ছিল অনেকাংশে। অনেক সময় উস্তাদগণ নিজ দায়িত্বে অতিতের প্রশ্নগুলো সংগ্রহ করে হল করে দিয়েছেন। বিশেষ করে উপরোক্ত দুই উস্তাদ তাদেরকে নিয়ে রাত-দিন মেহনত করেছেন। এভাবে মেহনত করতে করতে একপর্যায়ে বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় পরীক্ষার তিন মাস আগে তিনি নিজের ব্যাড-বিছানা বেঁধে সানসিটে রেখে দিয়েছেন। লাগাতার তিন মাস পর্যন্ত তিনি বিছানায় ঘুমাননি; বরং রাতে পড়তে থাকতেন, ঘুম আসলে বিছানা ছাড়াই বারান্দায় বা মসজিদের ফ্লুরে শুয়ে যেতেন। এভাবে মেহনত করে পরীক্ষা দেওয়া পর আল্লাহর বিশেষ রহমত ও হুজুরদের আন্তরিক দোয়াই তিনি মেধা তালিকায় প্রায় ৯০ টি মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে ৮ নম্বর বৃত্তি লাভ করেন। বহু বছর পর্যন্ত তাঁর পরবর্তী যারা যারা পরীক্ষার্থী ছিলেন, তারা সবাই তাঁর অভিজ্ঞতা এবং তাঁর লিখিত শরাহ ও সওয়াল- জবাবের নোট থেকে অনেক উপকৃত হয়েছে।
যখন তিনি ‘হেদায়াতুন্নাহু’ জামাতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করলেন, তখন তাঁর উস্তাদরা ২০০৪ সালের ‘শরহেজামী’ জামাতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাতেও বৃত্তি লাভ করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। তখন তিনি একই কায়দায় মেহনত করে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ৪ নম্বর বৃত্তি লাভ করেন। এ সবই ছিল আল্লাহর ফজল ও উস্তাদদের নেক নজর।
চ. ছাত্রজীবনের গুণাবলী:
- অধ্যয়নকালে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদাচারী। সহপাঠীর সবার সাথে সৎ ব্যবহার করতেন। কারো প্রতি অসৎ ও অন্যায় আচরণ করতেন না। তাঁর নীতি ছিল, ছাত্রজীবনে কারো সাথে দুশমনিও নয় আবার দোস্তিও নয়। বরং সবাইকে নিয়ে মিলে মিশে থাকতেন। কারো সঙ্গে ঝগড়া-ফাসাদ করতেন না। ছাত্রজীবনে অনেকেই তাঁর আচার-ব্যবহার ও গুণাবলী দেখে একান্তভাবে দোস্তি রাখতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি এসবের কোন পাত্তা দেননি। কারণ এক ছাত্র আরেক ছাত্রের সঙ্গে বেশি সখ্যতা ও মুহাব্বত তৈরি হলে পড়ালেখায় বড় ধরনের ক্ষতিসাধন হতে পারে। তাই তিনি সবার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রেখে চলতেন। তিনি অধ্যয়নকালে কারো বাড়িতে বেড়াতে যাননি, আবার কাউকে দাওয়াত দিয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেননি।
- তিনি অত্যন্ত আদব বজায় রেখে উস্তাদদের সাথে চলতেন। উস্তাদরা সবাই তাঁকে ভালোবাসতেন। তিনি উস্তাদদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতেন। উস্তাদদের যেকোন শাসন ও শাস্তিকে নিজের সংশোধনের সুবর্ণ সুযোগ মনে করতেন। এ নিয়ে কোনদিন তিনি ছাত্রদের মাঝে আলোচনা-সমালোচনা করতেন না। তাঁর জীবনে এমন কোন প্রমাণ নেই যে, তিনি উস্তাদদের শাস্তি ও ধমকের বিরুদ্ধে নিজের অভিভাবকের কাছে বিচার দিয়েছেন।
- তিনি ছিলেন ছাত্র জীবন থেকে অত্যন্ত আমানতদার ও বিশ্বস্ত। একটা সময় ছিল হারিকেন জ্বালিয়ে পড়া-লেখা চলতো। ঐ যামানায় অনেক সময় কেরোসিন তেল ও বিদ্যুৎ বিলের জন্য ছাত্রদের থেকে কিছু টাকা উত্তোলন করা হতো। জিম্মাদার উস্তাদ ছাত্রদের থেকে টাকা তুলে তাঁর কাছে জমা রাখতেন। এবং সময়ে সময়ে তাঁর থেকে টাকা নিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করতেন। বছরের শেষে তিনি এসবগুলোর হিসাব-কিতাব যথাযথভাবে সংশ্লিষ্টদের কাছে বুঝিয়ে দিতেন।
- তিনি কোনদিন নিজের ইলম, জ্ঞান ও মেধা নিয়ে অহংকার করেননি। সর্বদা তাওয়াজূ করে চলতেন। তবে তাঁর উস্তাদরা তাঁকে নিয়ে অহংকার করতেন। একদিনের ঘটনা, একদা এক বাৎসরিক পরীক্ষার বন্ধের দিন সকল ছাত্র-শিক্ষকদের উপস্থিতিতে কচুয়া মাদরাসার নাজিম সাহেব আল্লামা ফারুক আহমদ (ইমাম সাহেব হুজুর) হাফি. ছাত্রদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে বলে উঠলেন, তোমরা কিসের পড়াশোনা কর! তোমারা এই শফিউল্লাহ এর মত পড়তে পারো না! তার প্রতিটি সাবজেক্টের নম্বর হয়তো ৫০ না হয় ৪৯। তোমরা তার মত মেহনত করে পড়াশোনা কর, আশাকরি বড় আলেম হতে পারবে। জ্ঞাতব্য, তখনকার সময়ে মোট ৫০ নম্বরের উপর পরীক্ষা হতো।
ছ. তা’লীমি মুরব্বি ও বিশেষ উস্তাদ:
তিনি তাঁর পুরো অধ্যয়নজীবন তত্ত্বাবধায়ক উস্তাদ তথা তালীমি মুরব্বির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত করেছেন। তালীমি মুরব্বির সাথে পরামর্শ বিহীন নিজ থেকে কোন কিছু করতেন না। অধ্যয়নকালের সুচনা থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বাবধায়ক উস্তাদ ছিলেন, তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আলহাজ্ব মাওলানা উবায়দুল্লাহ আলবাকী হাফি. [সহকারী শিক্ষাসচিব, কচুয়া জামিয়া কাদেরিয়া মফিজিয়া মাদরাসা]। তারপর দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত তাঁর মুরব্বি ছিলেন, মুফতি শাহ আব্দুল কুদ্দুস (লাখাই হুজুর) হাফি. [শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, শাহবাজপুর মাদরাসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া]। অতঃপর উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর তালীমি মুরুব্বী ছিলেন, মুফতি নূর মোহাম্মদ (কিশোরগঞ্জী হুজুর) হাফি. [সিনিয়র মুহাদ্দিস ও মুফতি, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানীনগর]।
অপর দিকে তাঁর বিশেষ উস্তাদদের তালিকায় দেশের বহু বরেণ্য উলামায়ে কেরামদের নাম পাওয়া যায়, যাদের শিষ্যত্ত অর্জন করে তিনি হয়েছেন ধন্য। তাঁদের নিকট কিতাবী, আমলী ও আখলাকী সবক লাভ করে হয়েছেন দ্বীন-দুনিয়ায় সাফল্য। তাঁদের অমূল্য দিকনির্দেশনাগুলোই ছিল তাঁর আদর্শ জীবন গঠনের অনন্য পাথেয়। তাঁর বিশেষ উস্তাদদের মধ্য থেকে হলেন-
- হাইআতুল উলয়া ও বেফাকের সম্মানিত চেয়ারম্যান, যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার স্বনামধন্য মুহতামিম, জাতির কর্ণধার, আধ্যাত্মিক রাহবার, হযরতুল আল্লাম মুফতি মাহমুদ হাসান হাফি.।
- মাদানীনগর মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দিস ও আদব বিভাগীয় প্রধান, আদীবুল উদাবা, ভাষাবিদ আল্লামা সফিউল্লাহ ফুয়াদ হাফি.।
- চট্টগ্রাম নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসার সম্মানিত শায়খুল হাদীস ও উলূমুল হাদীস বিভাগীয় প্রধান, ক্বায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর আদরের জামাতা, বিদগ্ধ লেখক ও গবেষক আল্লামা মুফতী কুতুবুদ্দীন বিন জমীরুদ্দীন নানুপুরী হাফি.।
এছাড়া মাওলানা আহমদ ঈসা দা.বা., মাওলানা আনোয়ারুল হক দা.বা., মুফতি বশিরুল্লাহ দা.বা., মুফতি নূর মোহাম্মদ দা.বা., মাওলানা ফারুক আহমদ দা.বা., মাওলানা ফরিদুল হক দা.বা., মাওলানা উবায়দুল্লাহ আলবাকী দা.বা., মাওলানা আমীনুল হক ইবরাহিমী দা.বা., মাওলানা শাহ আব্দুল কুদ্দুস দা.বা.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জ. ইলমের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন:
তিনি হলেন ‘আরবী আদব’ ও ‘উলূমুল হাদীস’ এই শাস্ত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞান, সূক্ষ্ম অনুধাবন ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অধিকারী একজন প্রাজ্ঞ আলেম। আরবী ভাষা ও সাহিত্য তাঁর নিকট কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং চিন্তা, সংস্কৃতি ও দাওয়াতের একটি পরিশুদ্ধ মাধ্যম। হাদীস শাস্ত্রের উলূম ও দিরায়াহ বিষয়ে তাঁর সুগভীর দক্ষতা ও বিশ্লেষণী দৃষ্টি তাঁকে গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি উভয় শাস্ত্রের নানা বিষয়ে রচনা করেছেন তথ্যনির্ভর বহু প্রবন্ধ ও মূল্যবান অনেক গ্রন্থ। তাঁর লেখনীতে বিদ্যমান থাকে ভাষার সৌন্দর্য, যুক্তির দৃঢ়তা এবং দ্বীনী দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা।
ঞ. ইলম অর্জনে মাদরাসার কাজে আত্মনিবেদন ও উস্তাদদের খেদমত:
ইলম অর্জনের পথে উস্তাদদের খেদমত এবং মাদরাসার কাজ সফলতার মূল চাবিকাঠি—এই বিশ্বাস হযরতের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল ছাত্রজীবনের শুরুতেই। যখন তিনি তাঁর প্রিয় উস্তাদদের মুখে শুনেছিলেন, “যারা আন্তরিকভাবে মাদরাসার কাজ ও উস্তাদদের খেদমত করে, আল্লাহ তাদের ইলমে দ্বীনের অমূল্য রত্ন দান করেন।” এই অমোঘ বাণীকে পাথেয় করে তিনি সর্বদা খেদমতের সুযোগ খুঁজতেন। মাদরাসার যেকোনো সম্মিলিত কাজে তিনি থাকতেন সম্মুখসারিতে। ফাঁকি দেওয়া তো দূরের কথা, পূর্ণ দরদ ও নিষ্ঠার সাথে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতেন।
তাঁর সেই সময়ের ঐকান্তিক মেহনত ও অনুপম নিষ্ঠার কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো-
১. চামড়া সংগ্রহের ঘটনা:
সম্ভবত ২০০১ সালের কথা, হযরত তখন ‘নাহুমীর’ জামাতের ছাত্র। পবিত্র ঈদুল আযহার ছুটিতে মাদরাসার পক্ষ থেকে ছাত্রদের উৎসাহিত করা হলো যেন তারা নিজ নিজ এলাকা থেকে কুরবানীর চামড়ার টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। ছুটি শেষে যখন মাদরাসা খুলল, তখন কচুয়া মাদরাসার তদানীন্তন নাজিমে তালীমাত, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা ফারুক আহমদ (ইমাম সাহেব হুজুর) দা.বা. সকল ছাত্রকে মসজিদে বসিয়ে কালেকশনের হিসাব নিলেন।
একে একে ছাত্ররা হিসাব দিচ্ছিল। কারো সংগ্রহে ১০০ টাকা, কারো ১৫০, সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেল। কিন্তু যখন হযরতের পালা এলো, তিনি হুজুরের সামনে প্রায় ৫,০০০ টাকা (যা সেই সময়ের হিসেবে অনেক বড় অংক) পেশ করলেন। পুরো মজলিস এবং স্বয়ং হুজুর বিষ্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন!
হুজুর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত অল্প বয়সে তুমি এত টাকা কীভাবে সংগ্রহ করলে?”
তখন হযরত বললেন-
“হুজুর, আপনাদের দুআ পাওয়ার আশায় এবং মাদরাসার ভালোবাসায় আমি এই ছুটির পুরো সময়টা কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাইনি। বরং মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মাদরাসার জন্য এই অর্থ সংগ্রহ করেছি।”
হযরতের এই আন্তরিকতা, মাদরাসার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং উস্তাদদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা দেখে আল্লামা ফারুক আহমদ দা.বা. এতটাই অভিভূত হলেন যে, সেই বছরের বার্ষিক মাহফিলে হাজারো মানুষের সম্মুখে তাঁর এই পরিশ্রমের কথা ঘোষণা করলেন এবং ভালোবাসা ও দোয়া স্বরূপ তাঁকে ৫০০ টাকা পুরস্কৃত করলেন।
২. মাদরাসা নির্মাণ কাজ ও তালীমি খিদমতে হযরতের শ্রম:
তৎকালীন সময়ে ‘কচুয়া মাদরাসা’ বর্তমান স্থানে ছিল না; এটি ছিল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে। যখন মাদরাসার নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলো, তখন উস্তাদদের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো—নদীর তীরে অবস্থিত ‘নাহার ব্রিকফিল্ড’ থেকে ইট আনতে হবে। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেই পথ পাড়ি দিয়ে মাথায় করে ইট আনা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। অনেকে কিছুক্ষণ কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও কিংবা সরে পড়লেও, হযরত ছিলেন অদম্য। তিনি বীরদর্পে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাথায় করে ইট বহন করে নতুন ভবনের নির্মাণ কাজে কায়িক শ্রম দিয়েছিলেন। এমনিভাবে মাদরাসার নতুন ভবনের ফ্লোর বা মেঝে তৈরির সময় যখন মাটি ভরাট করে পানি দিয়ে তা মজবুত করার কাজ চলছিল, তখনও তিনি সক্রিয় উপস্থিত ছিলেন। হাড়ভাঙা খাটুনি আর কাদা-পানির সেই পরিশ্রমে তিনি ছিলেন অগ্রগামী এক সৈনিক।
৩. বিনয় ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত:
তাঁর স্বভাবজাত বিনয় ও নিরহংকার চিত্তের কারণে তিনি মাদরাসার যেকোনো সাধারণ কাজ বা মেহনতকে ছোট মনে করতেন না; বরং ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাইতো উস্তাদদের নির্দেশে মাদরাসার নর্দমা ও ময়লার ট্যাংকি পরিষ্কার করার মতো কঠিন ও আপাত অস্বস্তিকর কাজেও তিনি কখনো দ্বিধাবোধ করেননি। মাদরাসার পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনি নির্দ্বিধায় এই খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।
৪. কৃষি কাজে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা:
এমনকি মাদরাসার ধান ক্ষেতে চারা রোপণের কাজ যখন আসতো, তখন এই কাজে তাঁর তেমন একটা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি পূর্ণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাঁর হৃদয়ে কেবল একটিই লক্ষ্য ছিল—মাদরাসার রুহানি বরকত এবং প্রিয় উস্তাদদের নেক দুআ অর্জন করা।
৫. দুর্গম হাওরে ধান সংগ্রহ ও ইলমি বরকতের অন্বেষণ:
কচুয়া মাদরাসার একটি ঐতিহ্যবাহী দস্তুর বা নিয়ম ছিল—প্রতি বছর বৈশাখ মাসে মাদরাসার প্রয়োজনে মানুষের বাড়ি গিয়ে ধান সংগ্রহ করা। হযরত তখন ‘কাফিয়া’ জামাতের ছাত্র। সেই বছর মাদরাসার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর এক বিশেষ জিম্মাদারি অর্পণ করা হলো। উস্তাদদের নির্দেশ হলো, মাদরাসার শিক্ষক জনাব নাজমুল হাসান স্যারের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইনের হাওর অঞ্চলে গিয়ে ধান সংগ্রহ করতে হবে।
নাজমুল স্যারের আত্মীয়-স্বজনরা হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদে ‘বাতান’ (অস্থায়ী ঘর) তৈরি করে থাকতেন। সেই সুবাদে স্যার হযরতকে এবং আরও একজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে সেই দুর্গম এলাকায় ধান সংগ্রহে বের হলেন।
হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে ধান সংগ্রহ করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। অনেক সময় এমন হতো যে, ধান সংগ্রহ করতে করতে তাঁরা মূল বাসস্থান বা ‘বাতান’ থেকে প্রায় ৫-৭ কিলোমিটার দূরে চলে যেতেন। মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত ও তপ্ত পথ পাড়ি দিয়ে সংগ্রহ করা সেই ধান মাথায় করে বহন করতে হতো। হযরত এবং তাঁর সাথী ভাই সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় আধামণ ওজনের ধানের বস্তা মাথায় করে বাতানে নিয়ে আসতেন।
তপ্ত রোদ, ধু-ধু হাওর আর মাথার ওপর ধানের বোঝা—সবকিছুই তিনি হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। তাঁর অন্তরে কেবল একটিই তামান্না ছিল—প্রিয় উস্তাদদের নেক দুআ, আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টি এবং ‘ইলমে নববী’র নূর হাসিল করা। ছাত্রজীবনের এই প্রতিটি ঘামবিন্দু আজ তাঁর সফল ও বরকতময় জীবনের এক একটি সোপান হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
৬. উস্তাদদের খেদমতে আত্মনিয়োগ ও দুআ অন্বেষণ:
মাদরাসার খেদমতের পাশাপাশি হযরতের হৃদয়ে উস্তাদদের ব্যক্তিগত খিদমতের প্রতি ছিল এক অনন্য ব্যাকুলতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, কিতাবের পাঠ যেমন জরুরি, উস্তাদের সন্তুষ্টি ও দুআ অর্জন তার চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়। তাই সুযোগ পেলেই তিনি উস্তাদদের খিদমতে নিজেকে বিলিয়ে দিতেন।
শুক্রবার বা জুমুআর দিন যখন অন্য ছাত্ররা বিশ্রামে ব্যস্ত থাকত, তখন হযরতের ব্যস্ততা বেড়ে যেত কয়েক গুণ। তিনি নিয়ম করে প্রিয় উস্তাদদের হুজরায় (রুমে) যেতেন। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে হুজুরদের ব্যবহৃত কাপড় ধোয়া, রুম পরিষ্কার করা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ আছে কি না—তার খোঁজ নিতেন। উস্তাদদের অনুমতি পেলে পরম আগ্রহে সেই কাজগুলো করে দিতেন।
তাঁর এই খেদমতের পরিধি কেবল মাদরাসার চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক সময় উস্তাদদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাঁদের বাসা-বাড়িতে গিয়েও কাজ করে দিতেন। বিশেষ করে কচুয়া মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আমিনুল হক (বালিখোলা হুজুর) দা.বা.-এর বাড়িতে গিয়ে অনেকবার তাঁর ধানক্ষেতে চারা রোপণসহ পারিবারিক নানা কাজে কায়িক শ্রম দিয়েছেন। এমনকি বৈশাখের ধান কাটার মৌসুমেও অন্যান্য উস্তাদদের সহযোগিতায় তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
বাস্তবতা হলো, ছাত্রাবস্থায় এই ধরনের ভারী কায়িক শ্রম বা কৃষি কাজে হযরতের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কাজের ধরণগুলো তাঁর জন্য বেশ কঠিন ছিল এবং হয়তো সবসময় নিখুঁতভাবে করতেও পারতেন না। তবুও তাঁর মাঝে ছিল না কোনো ক্লান্তি বা সঙ্কোচ। অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও তাঁর মাঝে আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল না। উস্তাদদের নেক নজর ও হৃদয়ের গভীর থেকে আসা দুআ লাভই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও সাধনা।
ট. শিক্ষাজীবনে যাঁদের অবদান ও সহযোগিতা অবিস্মরণীয়:
হযরতের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেই বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ত্যাগ হযরতের জ্ঞানার্জনের পথকে সুগম করেছে। কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁদের কয়েকজনের নাম ও অবদানের কথা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. হাফেজ ক্বারী আব্দুল্লাহ সাহেব দা.বা. (শ্রদ্ধেয় বড় দুলাভাই):
হযরতের ঢাকা অবস্থানকালীন শিক্ষাজীবনে তাঁর বড় দুলাভাই হাফেজ ক্বারী আব্দুল্লাহ সাহেবের অবদান অনস্বীকার্য। হযরত যখন যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় পড়তেন, তখন তিনি তাঁর ছায়ার মতো পাশে ছিলেন।
ক্বারী আব্দুল্লাহ সাহেব ঢাকার ফার্মগেটস্থ মনিপুরীপাড়ার এক মসজিদের সানী ইমাম ও মুয়াজ্জিন ছিলেন। হযরত প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর মাদরাসা থেকে দুলাভাইয়ের বাসায় যেতেন। তিনি হযরতকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে মেহমানদারি করতেন এবং অকৃত্রিম স্নেহে নিজের হাতে রান্না করে সুস্বাদু খাবার খাওয়াতেন। মেহমানদারির সকল কাজ তিনি একাই করতেন, কাউকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করতে দিতেন না।
হযরতের যখনই কোনো প্রয়োজন হতো—তা টাকা-পয়সা হোক বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হোক—দুলাভাইয়ের পরম নির্ভরতায় তা পূরণ করতেন। এমনকি হযরত অসুস্থ হয়ে পড়লে দুলাভাইয়ের বাসাতেই চলে যেতেন। একজন মমতাময়ী মা যেভাবে নিজের সন্তানকে আগলে রাখেন, তিনিও তেমনি স্নেহ ও মমতা দিয়ে হযরতের সেবা-শুশ্রূষা করতেন। এভাবেই দীর্ঘ পাঁচটি বছর তিনি এই ত্যাগ ও মেহনতের জিম্মাদারি হাসিমুখে আঞ্জাম দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা এই মুখলিস মানুষটিকে উত্তম জাযা দান করুন; তাঁর ইহকালীন ও পরকালীন জীবনকে সৌভাগ্যের নূরে আলোকিত করুন। আমিন।
২. পারিবারিক তরবিয়ত ও অভিভাবকত্বের প্রভাব:
হযরতের ব্যক্তিত্ব গঠনে তাঁর আম্মাজান এবং শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা আগেও কিছুটা বলা হয়েছে । তাঁদের কঠোর নজরদারি ও স্নেহভরা শাসনই তাঁর জীবনকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আম্মাজানের আদর্শিক তরবিয়ত: হযরতের আম্মাজান তাঁর আখলাক ও চরিত্রের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। তিনি সবসময় খেয়াল রাখতেন যেন হযরত বখাটে ছেলেদের সংস্পর্শে না যান এবং টিভি-সিনেমা থেকে দূরে থাকেন। মাগরিবের পর তাঁকে কখনোই ঘরের বাইরে থাকতে দিতেন না।
এ প্রসঙ্গে হযরত আমাদের সামনে একটি স্মৃতিচারণ করেন—একদিন এশার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় তিনি অবচেতন মনে একটি শিস দিলেন। শিসের শব্দ শোনা মাত্রই মা প্রশ্ন করলেন, “শিস কে দিয়েছে?” হযরত স্বীকার করলে মা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বললেন, “খবরদার! শিস দেওয়া বখাটেদের কাজ। সৎ ও ভদ্র ছেলেরা এসব করে না।” মায়ের সেই শাসনমাখা উপদেশ হযরতের মনে আজও দাগ কেটে আছে।
বড় ভাইয়ের পথনির্দেশনা ও যোগ্যতা গঠন: হযরতের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই তাঁর পড়াশোনা, আমল ও শিষ্টাচারের সার্বিক তদারকি করতেন। ছোট ভাইয়ের সময়কে কাজে লাগানোর জন্য তিনি কোনো বাৎসরিক ছুটিতেই তাঁকে বাড়িতে বসে থাকতে দিতেন না; বরং বিভিন্ন ইলমি কোর্সে পাঠিয়ে দিতেন। এমনকি এক রমজানে তাঁকে হযরতের উস্তাদ ‘লাখাই হুজুর’-এর সাথে যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় ইতিকাফের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
ছোট ভাইয়ের মধ্যে সৎ সাহসিকতা ও সামাজিক নেতৃত্ব বিকাশের জন্য বড় ভাই কৌশল অবলম্বন করতেন। তিনি নিজে মসজিদে ইমামতি না করে অনেক সময় হযরতকে দিয়ে নামাজ পড়াতেন। শবে কদর, শবে বরাত এবং দুই ঈদের দিন বড় জামাতে তাঁকে বয়ান করার সুযোগ করে দিতেন। একদিন বড় ভাই হযরতকে ইলম অর্জনের প্রতি আরো উৎসাহিত করতে নিজেকে ছোট করে বলেছিলেন-
শোনো! দাওয়াত খাওয়ার মতো মৌলভী তো আমরা আছিই। তোমাকে হতে হবে মানুষের হিদায়াতের আলোকবর্তিকা—একজন বিজ্ঞ আলেম। ভালো করে পড়াশোনা করো এবং বড় আলেম হও। এটাই তোমার কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়া।”
হযরত তাঁর বড় ভাইয়ের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব যেমন পড়েছেন, তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক আদব-কায়দাও শিখেছেন। সত্য কথা হলো, তাঁর বড় ভাই ছিলেন তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা, চেতনা ও যোগ্যতার মূল বাতিঘর এবং প্রধান পথনির্দেশক। আল্লাহ তাআলা তাঁকে উভয় জাহানে পূর্ণ জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমিন।
৩. পরিবারের অন্য বড় ভাইদের অকৃত্রিম সহযোগিতা ও ত্যাগ:
বড় ভাইয়ের পাশাপাশি হযরতের মেজো ও সেজো ভাইয়ের ত্যাগ ও সহযোগিতাও ছিল চিরস্মরণীয়। তাঁরা হলেন যথাক্রমে— জনাব আলহাজ্ব অলিউল্লাহ আলবাকী দা.বা. এবং আলহাজ্ব মাওলানা আমীনুল্লাহ আলবাকী দা.বা.। ভাই-বোনদের উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় ব্যয়ভার তাঁরা পরম মমতায় বহন করেছেন। এমনকি সবার সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁরা নতুন ঘরবাড়িও নির্মাণ করেছেন।
মেজো ভাই জনাব অলি উল্লাহ সাহেবের অনন্য ভূমিকা: বিশেষভাবে তাঁর দ্বিতীয় ভাই জনাব অলিউল্লাহ সাহেবের কথা না বললেই নয়। এক সময়ে তিনি একাই সকল ভাই-বোনের সার্বিক দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর উদারতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি তাঁর স্নেহের ছোট ভাইদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন-
“তোমরা যে যতটুকু উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চাও, করো; কোনো বাধা নেই। পড়াশোনার ক্ষেত্রে টাকা-পয়সার চিন্তা তোমাদের একদম করতে হবে না।”
তিনি কেবল প্রতিশ্রুতিই দেননি; বরং বাস্তবেও তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তাঁর এই স্নেহ ও সহমর্মিতা কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এককভাবে অর্থ যোগান দিয়ে ছোট দুই বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন এবং বড় ভাইয়ের বিবাহেও বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।
তাছাড়া হযরতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। হযরতের বিবাহের সময় তিনি উপহার হিসেবে প্রায় চার ভরি স্বর্ণ প্রদান করেন এবং হযরতের বড় ছেলের সুন্নতি আকিকার সম্পূর্ণ ব্যবস্থাও তিনি নিজ উদ্যোগে করেন। সংসারের প্রতিটি সুখ-দুঃখে তাঁর এই বর্ণনাতীত অবদান হযরতের স্মৃতিতে আজও অম্লান।
আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দুই সুযোগ্য ভাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তাঁদের ছায়াকে দীর্ঘস্থায়ী করুন। আমিন।
৪. কর্মজীবন তথা শিক্ষকতা ও তা’লীমী কার্যক্রম:
২০১৩ সালের রমাযান মাস থেকে তাঁর কর্মজীবন ও অধ্যাপনার শুভ সূচনা হয়। শিক্ষকতার প্রথম প্রহরেই তিনি ‘উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ’-এর সহকারী প্রধান হিসেবে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি যখন অত্র জামিয়ার ‘উচ্চতর হাদীস গবেষণা’ সমাপ্ত করেন, তখন হাদীস বিভাগীয় প্রধান আল্লামা মুফতি কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি. তাঁর কর্মস্পৃহা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মাহারত দেখে তাঁকে তাঁর সহকারী হিসেবে রাখার জন্য জামিয়ার সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বোর্ড ‘মাজলিসে ইলমীর’ নিকট প্রস্তাব রাখেন । তাঁরা তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে হযরতকে উচ্চ পদে নিয়োগ প্রদান করেন।
হাদীস বিভাগের ‘সহকারী প্রধান’ হওয়ার পিছনের প্রেক্ষাপট:
একদিন হাদীস বিভাগের প্রধান কুতুবুদ্দীন সাহেব নির্জনে তাঁকে তাঁর নিজ কক্ষে ডেকে নিলেন এবং বললেন, উলূমুল হাদীস বিভাগের জন্য আমার একজন সহকারী উস্তাদের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমি তোমাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছি। এতে তোমার মতামত কী? তখন তিনি তাঁর উস্তাদকে আদবের সাথে বললেন, হুজুর! এই বিষয়ে তালীমী মুরব্বির সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা করছি। হুজুর বললেন, ঠিক আছে, ভালো হবে।
তখন তিনি তাঁর তালীমী উস্তাদ মাদানীনগর মাদরাসার সিনিয়র মহাদ্দিস, আল্লামা মুফতি নূর মোহাম্মদ হাফি. এর নিকট গেলেন এবং এই বিষয়টি উপস্থাপন করে পরামর্শ চাইলেন। সেই সাথে নিজের এই তামান্নার কথাও জানালেন যে, হুজুর! আমার ইচ্ছা হলো, এখনই কর্মজীবনে না গিয়ে ইফতা বিভাগে ভর্তি হয়ে আরও কিছুদিন মেহনত করা।
হুজুর তাঁর সমস্ত কথা শুনে তাঁকে বললেন, শোনা! তোমাকে ইফতা পড়ার দরকার নাই। মূলত ইফতা হল ‘যোগ্যতার’ নাম। যার ভিতরে যোগ্যতা আছে, সে মুফতি হতে পারে। আর যার ভিতরে যোগ্যতা নেই সে ইফতা পড়লেও মুফতি হতে পারে না। তুমি তোমার দরদী উস্তাদ মুফতি কুতুবুদ্দীন সাহেবের কথা মেনে তাঁর সহকারী হিসেবে হাদীস বিভাগে নিয়োগ হয়ে যাও। এমন হিতাকাঙ্খী উস্তাদ আর কোথাও পাবে না। তুমি তাঁর তত্ত্বাবধানে থেকে ফন্নে হাদীসে মাহের হয়ে যাও। ইফতা পড়ার প্রয়োজন নাই। এখনকার যারা ইফতা পড়ে তাদের অনেকেই ‘ইফতা’ কোন্ সীগা তাও বলতে পারে না। এ জাতীয় ইফতা পড়ার মানে কী? আর এই জাতীয় মুফতি হয়ে লাভ কী? বরং এরচেয়ে তুমি এক বিষয়ে পরিপূর্ণ মাহারত অর্জন করো। ইনশাআল্লাহ তুমি ইফতা না পড়েও মুফতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
দরস ও একাডেমিক অবদান:
‘শিক্ষকতা’ পেশা তাঁর কাছে কোনো জীবিকা নয়; বরং এক বিশেষ আমানত ও গুরু দায়িত্বের বিশেষ ক্ষেত্র। ওহীর জ্ঞান বিতরণ ও শিক্ষার্থীদের আদর্শ জীবন গঠন—এই মহান দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পালন করছেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তিনি দরস ও তাদরীসের ময়দানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রেরণাদায়ী শিক্ষক হিসেবে।
তাঁর পাঠদানের ধরণ হলো প্রাঞ্জল, হৃদয়গ্রাহী ও বিশ্লেষণভিত্তিক। তিনি পাঠদানকালে একটি পড়া একবার নয়, কয়েকবার বলেন, যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাসের সবক ক্লাসেই আয়ত্ত করে নিতে পারে। শুধু তাই নয় তিনি ক্লাসে কিতাবের বিষয়সমূহ এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, জটিল আলোচনাও শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ ও বোধগম্য হয়ে উঠে। কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে, ছাত্রদের চিন্তাশক্তি জাগিয়ে তোলা, গবেষণার প্রতি আগ্রহ সঞ্চার করা এবং আত্মশুদ্ধি ও আদব-আখলাকের অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করা হল তাঁর শিক্ষাকর্মের প্রধান লক্ষ্য।
পাঠদানের পাশাপাশি তিনি পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, একাডেমিক পরিকল্পনা এবং পরীক্ষার মানোন্নয়নসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে তাঁর চিন্তা, পরামর্শ ও উদ্যোগ একাডেমিক মহলে অত্যন্ত প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য।
সারকথা: তাঁর শিক্ষকতা কেবল জ্ঞান প্রদান নয়; বরং প্রজন্ম গঠনের এক মহান মিশন। তাঁর দরস, দিকনির্দেশনা ও মমতামিশ্রিত আচরণ শিক্ষার্থীদের অন্তরে এমন ছাপ ফেলে, যা তাদের কর্মজীবনে সদা অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে।
বৈবাহিক জীবন:
তিনি পড়ালেখা শেষ করার ষষ্ঠ বছর এবং শিক্ষকতার দ্বিতীয় বছর ২০১৪ সালে বিবাহ করেন। তিনি তাঁর এলাকা থেকে অদূরে অবস্থিত ধামাউড়া গ্রামের লাউড় বাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিবাহ করেন। তাঁর শ্বশুর একজন বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ ও হক্কানী-রব্বানী আলেম। তিনি মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.-এর অত্যন্ত কাছের শাগরিদে রশীদ। ফারাগাত শেষে তিনি মুফতি আমিনী রহ.- এর দিকনির্দেশনা ও হুকুমে হালাল ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। এবং সেই সাথে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় দু-একটি মাদরাসায় ‘মুসলিম শরীফ’, ‘মেশকাত শরীফ’, ‘মিরকাত’, বূস্তা ও গুলিস্তা ইত্যাদি কিতাব পড়ান। তাঁর শ্বশুর বাড়ির সবাই আলেম-আলেমা। সবাই খাস পর্দার প্রতি বিশেষ যত্নশীল।
হযরতের সহধর্মিনী ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড়। তিনি অত্যন্ত সুশিক্ষায় শিক্ষিত। দ্বীনের বিধি-বিধান অনুসরণে তিনি খুবই আগ্রহী। স্বামীর ও শশুর-শাশুড়ির খেদমত এবং সাংসারিক কাজকর্মে অত্যন্ত দরদী ও দায়িত্বশীল। তাঁর মধ্যে রয়েছে বহু ঈর্ষণীয় গুণাবলী। তন্মধ্যে- উদারতা, কৃতজ্ঞতা, পরকল্যাণকামিতা, সহিষ্ণুতা, অল্প তুষ্টি ও ধৈর্য ইত্যাদি গুণাবলী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসবের চেয়ে বড় গুণ হলো, গুনাহ মুক্ত থাকা ও পাপ-পুঙ্কিলতা মুক্ত জীবন গড়ার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। বিশেষভাবে ছেলে-মেয়েদের লালন পালন, শিক্ষা-দীক্ষা, আদব-আখলাক, সভ্যতা ও আচার-ব্যবহার শেখানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অস্বীকার্য। (আল্লাহ তাঁকে নেক হায়াত দান করুন।)
হযরতের বর্তমানে ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে তিন মেয়ে। বড় ছেলে হেফজ খানায় পড়ছে। বড় মেয়ে নুরানী দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। বাকি দুই মেয়ের এখনো পড়ার বয়স হয়নি।
স্মরণীয় কিছু ঘটনা ও শিক্ষা:
ঘটনা নং ১.
তিনি যখন তিন বৎসর উলূমুল হাদীস অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন, তখন তাঁর উস্তাদরা খুবই যাচাই-বাছাই করে এবং মুহাব্বত করে তাঁকে অত্র মাদরাসার শিক্ষক পদে নিয়োগ দেন। নিয়োগ দেওয়া সময় তাকে আদর করে বলা হয়েছিল যে, মৃত্যু পর্যন্ত এখানে খেদমত করার নিয়ত করবে।
যাইহোক পূর্ণ দরদ ও ইখলাস নিয়ে চলছে তাঁর খেদমতের প্রারম্ভিক জীবন। একদা খেদমতের ৩-৪ বছরের মাথায় তাঁর শ্বশুর তাঁকে বললেন, কুমিল্লার লাকসামে একটি ভালো খেদমতের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেটি হলো ‘জামিয়া মুহাম্মাদিয়া লাকসাম’- এর মুহাদ্দিস পদ। আপনি সেখানে খেদমত করলে অনেক ভালো হবে। সেখানে অনেক সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। যেমন: ভালো বেতন, উন্নত মানের খাবার, চার রুম বিশিষ্ট কোয়াটার, দুই ঈদে বোনাস, লুঙ্গি-শাড়ি এবং হুজুরদেরকে পর্যায়ক্রমে হজে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, ইত্যাদি। তখন নানুপুরে তাঁর বেতনের স্কেল ছিল সম্ভবত ৭ হাজার। আর সেখানে বেতনের স্কেল ছিল ১৩ হাজার।
সেখানকার খেদমতের প্রতি তাঁর তেমন একটি আগ্রহ না থাকলেও শশুরের পীড়াপীড়িতে একদিন তিনি দেখার উদ্দেশ্যে সেখানে গেলেন। সেখানে যাবার পর ঐ মাদরাসার নির্বাহী মুহতামিম সাহেব তাঁর থেকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিলেন। অতঃপর জানালেন যে, আপনি ইন্টারভিউতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আমাদের এই জামিয়ার প্রধান পরিচালক ও মুহতামিম সাহেব ঢাকায় থাকেন। তাই আপনি কালবিলম্ব না করে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ না করে নানুপুরে চলে আসলেন। তার ইচ্ছা হল সেখানে তিনি খেদমত করবেন না।
এদিকে তাঁর শ্বশুর উত্তীর্ণের কথা শুনে শীঘ্রই ঢাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। শ্বশুরের কথাই তিনি ঢাকার বাড্ডায় গিয়ে ঐ মাদরাসার মুহতামিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন তিনিও পুনরায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিলেন। অতঃপর খেদমত কনফার্ম করলেন এবং বললেন আগামী মাস থেকে আপনি নিয়োগ দিন। তবে শর্ত হলো, আপনি এখানে শিক্ষকতা করা কালে ইমামতি, খেতাবত, ওয়াজ-কালাম ইত্যাদি কোন কিছুই করতে পারবেন না। শতভাগ মাদরাসায় সময় দিতে হবে।
যাইহোক তিনি ঢাকা থেকে নানুপুরে এসে শ্বশুর, ভাই-ব্রাদার ও অন্যান্য উস্তাদেরকে বিস্তারিত হালাত জানালেন। সবার এক কথা নানুপুর থেকে বিদায় নিয়ে সেখানে চলে গেলে ভালো হবে। তখন তিনি বললেন, নানুপুর মাদরাসা থেকে চলে যাওয়ার কথা আমি বলতে পারব না। আমি উস্তাদদের কাছে বিদায়ের কথা বলতে পারব না। যদি যাইতেই হয় , তবে আপনারা এসে আমার বিদায়ের বিষয়ে কথা বলুন।
তো তাঁর বড় ভাই এবং তাঁর এক প্রিয় উস্তাদ মাওলানা শাহ আব্দুল কুদ্দুস সাহেব আসলেন। তাঁরা দুজন ইতিপূর্বে নানুপুর মাদরাসা কখনো দেখেননি। তাঁরা দুজন যখন আসলেন, তাঁরা মাদরাসার বিশালতা ও ইলমী পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বললেন, এত বড় মাদরাসা থেকে বিদায় নেওয়া ভালো হবে না।
বিদায় নেওয়া আর হলো না। যাবার আগে তাঁরা দুজন হাদীস বিভাগীয় প্রধান, মুফতি কুতুব উদ্দীন নানুপুরী দা.বা.-এর সাথে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। হুজুর সব কথা শোনার পর বললেন, আপনারা লাকসাম মাদরাসার যে ৫-৬ টি বিশেষ সুযোগ-সুবিধার কথা বললেন এর চেয়ে বেশি সুবিধা এই জামিয়ায় সে পাবে ইনশাআল্লাহ। মাত্র দু’চার বৎসর ধৈর্য ধারণ করতে বলুন। দেখবেন সারা বাংলাদেশে তার ছাত্রে ভরে যাবে। তার সুনাম-সুখ্যাতি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। সুযোগ-সুবিধার অভাব হবে না ইনশাআল্লাহ।
হুজুরের কথা আল্লাহ তায়ালা অক্ষরে অক্ষরে কবুল করেছেন। মাত্র অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে লাকসাম মাদরাসার যাবতীয় সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন তো বটেই এছাড়াও বহু গুণে সুযোগ-সুবিধা ও ইজ্জত-সম্মান আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন।
ঘটনা নং ২.
হযরতের আম্মাজান ও ভাইয়েরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ হজ্ব কমপ্লিট করে ফেলেছেন। কিন্তু হযরত তখনও হজ্ব করতে পারেননি। যার ফলে তাঁর আম্মাজান প্রায়ই আফসোস করে বলতেন, হায় আমার এই ছোট ছেলে কি কখনো হজ্ব করতে পারবে?! তাঁর তো বেতন-আয় খুবই কম। সে কিভাবে হজ্ব করবে? এই বলে আফসোস করতেন আর দোয়া করতেন।
একদা ২০১৯ সনে নানুপুর মাদরাসার মহাপরিচালক, পীর সাহেব হুজুর (আল্লামা শাহ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী) দা.বা. হযরতকে ডাকলেন আর বললেন, তোমার কয়েক কপি ছবি এবং এনআইডি কার্ডের ফটোকপি থাকলে আমাকে দাও। তিনি দিলেন।
নানুপুরী পীর সাহেব হুজুর তাঁকে খুবই আদর-স্নেহ করেন। একদিন তিনি তাঁকে ডেকে বললেন, আমার একজন মুহাব্বতের মানুষ তুমাকে সহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে হজ্বে নেওয়ার মনস্থ করেছেন। দোয়া করতে থাকো। এই কথা শুনে হযরত যার পর নাই আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর দরবারে কাঁদতে লাগলেন। এক পর্যায়ে হজ্বে যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হলো।
যেই মহান ব্যক্তি নানুপুরী পীর সাহেব হুজুরের কথায় হযরতকে এবং অন্যান্য উস্তাদদেরকে হজে নিয়েছেন, তিনি খুবই বিত্তবান মানুষ। তিনি মনের দিক থেকে এতটাই উদার যে, সবার হজের খরচ শতভাগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় মাস চলার মতো অতিরিক্ত টাকাও দিয়েছেন। (সুবহানআল্লাহ)
অপর দিকে হযরত চট্টগ্রাম শহরের চশমাহিল এলাকার মেয়র গলির ‘সুলতানিয়া ইসলামিক একাডেমি জামে মসজিদে’ জুমার নামাজ পড়ান। সেখানে হঠাৎ এক প্রিয় মুসল্লি হযরতকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে বললেন, আপনি এই টাকা দিয়ে উমরা করবেন এবং আমার জন্য দুয়া করবেন। তো এভাবে দেখা গেল যে, হযরতের এই মোবারক হজের সফর কমপ্লিট করতে নিজের এক টাকাও খরচ করতে হয়নি। এসবি আল্লাহর খাস রহমত এবং মা ও উস্তাদদের আন্তরিক দুআর ফসল।
ছাত্র তত্ত্বাবধান ও বিশেষ কোর্স পরিচালনায় তাঁর সফলতা:
তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন; বরং ছাত্রদের সার্বিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে তাঁর রয়েছে নিবেদিত মনোযোগ ও পিতৃসুলভ তত্ত্বাবধান। বহু ছাত্ররা তাঁকে তালীমী মুরব্বী তথা শিক্ষাবিষয়ক তত্ত্বাবধায়ক উস্তাদ মেনে জীবন পরিচালনা করছে। তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি, একাডেমিক শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সদা তৎপর। প্রতিটি ছাত্র যেন তার মেধা, নৈতিকতা ও আমলের দিক থেকে পরিপূর্ণভাবে আদর্শ জীবন গড়তে পারে—এ লক্ষ্যে তিনি অবিরাম দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তাছাড়া সময়ের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বিকাশের প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন সময় বিশেষ কোর্স ও কর্মশালার আয়োজন করেন। বিশেষভাবে রমাযানের আগে ও রমাযান মাসে তিনি নাহু-সরফের কোর্স এবং আরবী আদবের কোর্সে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এসব কোর্সে তিনি আধুনিক ও গবেষণামূলক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের নাহু-সরফ ও আরবীর দুর্বলতা দূর করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে থাকেন।
তাঁর এই উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানের ফলে বহু ছাত্র নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেছে এবং নিজেদের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। এক কথায়, ছাত্রগঠন ও একাডেমিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এক আলোকবর্তিকার মতো, যা পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পথ দেখিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর ছাত্র ও শাগরেদবৃন্দের পরিচয়:
তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও দরসের জীবনে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ছাত্রসমাজ, যারা তাঁর জ্ঞানের আলো ও চরিত্রের প্রভাব বহন করে সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর দরসে শিক্ষালাভকারী বহু ছাত্র আজ দেশের বিভিন্ন নামকরা মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, গবেষক ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শুধু দেশেই নয়, বিদেশের বিভিন্ন ইসলামী কেন্দ্র ও দাওয়াতি অঙ্গনেও তাঁর ছাত্ররা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন, যা তাঁর শিক্ষাদানের আন্তরিকতা ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তাঁর শাগরেদগণ শুধু জ্ঞানার্জনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তাঁর কাছ থেকে আদব, চরিত্র, কর্মনিষ্ঠা ও দাওয়াতি প্রজ্ঞার বাস্তব অনুশীলন শিখেছেন।
তাঁর ছাত্ররা আজও তাঁর দরস ও দিকনির্দেশনার স্মৃতি বুকে ধারণ করে সমাজে ইসলামী জ্ঞান, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলা যায়, তাঁর প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে তাঁর ছাত্রদের মাঝে—যারা তাঁর শিক্ষার উত্তরসূরি ও দাওয়াতি ধারার ধারক-বাহক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর রচনা ও গ্রন্থাবলি:
হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমুদী হাফি. তাঁর কর্মজীবনের ফাঁকে ফাঁকে ছাত্র-ছাত্রী ও মুসলিম জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সমাজ সংস্কারমূলক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ সকল গ্রন্থের সাবলীল ভাষা ও উন্নত বিষয়বস্তু সত্যিই পাঠককে বিমোহিত করে। সেই সাথে পাঠক ও পাঠিকাকে আদর্শ জীবন গড়তে এবং আল্লাহর হুকুম আহকামগুলি মেনে চলতে ও খোদাভীরু হতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
তাঁর রচিত, সম্পাদিত ও অনূদিত বইয়ের মধ্যে-
ক. রচিত বইসমূহ:
- তালেবে ইলমের পঠন আদর্শ জীবন গঠন
- আধুনিক আরবী শিক্ষার আলোকিত পথ-১
- আধুনিক আরবী শিক্ষার আলোকিত পথ-২
- সহীহ হাদীসের আলোকে নামাজে নাভির নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত
- নন্দিত চ্যানেলে নিন্দিত সম্প্রচার (শিরোনাম ভালো মতলব খারাপ)
- দৃষ্টিভঙ্গির পরিশুদ্ধি
- আল্লাহর সংবিধান
- ‘সহীহ হাদীস’ শিরোনামে ভ্রান্ত পথের আহ্বান
- যুগ শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদদের মানদন্ডে সহীহ হাদীস ও তার স্তর বিন্যাস (তাকসীমে সাবয়ী- এর উপর বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা)
- দাওরায় হাদীসের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ‘প্রাথমিক নির্দেশিকা’
- البيان والتعريف في كتابة الحديث الشريف
- الانتقاد في الرواة المختلفين، الذين تضاربت فيهم الأقوال من الناقدين
- الدُّرَّة الغُرّة في وضع اليدين تحت السُّرَّة
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-১
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-২
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-৩
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-৪
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-৫
- আস-সালাহ আরবী ম্যাগাজিন-৬
খ. সম্পাদিত গ্রন্থাবলি:
- জান্নাতের সুনিশ্চিত পথ- মাওলানা আবু হোরাইরা রচিত।
- মাযহাব মানা শিরক নয়- মুফতি আমজাদ হোসাইন রচিত।
গ. অনূদিত গ্রন্থাবলি:
- আশরাফুল হিদায়াত লি ইসলাহিল মুনকারাত- মাওলানা আবরারুল হক রহ. ( অনুবাদ চলমান)
- রাহে আমল- মাওলানা ইউসুফ মুতালা ( অনুবাদ চলমান)
ঘ. শরাহ বা ব্যাখ্যা গ্রন্থ:
جناح النّجاح شرح اردو مراح الأرواح
শিক্ষকতা ও দরসের অভিজ্ঞতা:
মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমুদী-এর ভাই-বেরাদার, চাচা-ফুফা ও ভগ্নিপতিদের অনেকেই বিদেশে থাকেন। যার ফলে তাঁর জন্য পড়ালেখা শেষ করে জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়াটা ছিল অতি মামুলি ব্যাপার। কিন্তু তিনি পড়াকালীন সময়ে সদা সর্বদাই আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ ফারাগাতের পর আপনি আমাকে বিদেশে না নিয়ে দ্বীনের একজন নগন্য খাদেম হিসেবে একটি ছোট্ট মক্তবের খেদমত হলেও ব্যবস্থা করে দিয়েন’। প্রতিদিন সালাতুল হাজত পরে কায়মনোবাক্যে রব্বে কায়েনাতের দরবারে এই দোয়া করতে থাকতেন।
আল্লাহ তাঁর এই একান্ত নিবেদন কবুল করলেন, বরং উত্তমভাবে কবুল করলেন। তাঁকে শুধু মক্তবের নয়; বরং বাংলাদেশের এক বিশাল ও সুপ্রসিদ্ধ জামিয়ার সিনিয়র মুহাদ্দিস বানিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বহু বছর যাবত শিক্ষকতা ও দরস-তাদরীসের সাথে যুক্ত রয়েছেন। সহজ ভাষায় গভীর বিষয় উপস্থাপনে তাঁর দক্ষতা খুবই প্রশংসনীয়। তাঁর সাজানো গোছানো ও পরিপাটি দরসে বহু ছাত্র-ছাত্রী উপকৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। সকল ছাত্ররা-ছাত্রীরা তাঁকে আদর্শ শিক্ষক ও অভিজ্ঞ মুরব্বি হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে থাকে।
উপরোক্ত বিবরণ হল তাঁর বাস্তবিক হালত। কিন্তু তার বিনয়ী দৃষ্টিভঙ্গি ও সরল অভিজ্ঞতা হলো, মানুষের গুণ ও যোগ্যতা মূল বিবেচ্য নয়, সবকিছুর মূলে হলো, আল্লাহর কবূলিয়ত। পড়ালেখায় মেহনত করে এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে এই ‘কবূলিয়ত’ অর্জন করতে হয়। তিনি বলেন, কোনদিন আমার দিল এই মর্মে সাক্ষী দেয়নি যে, আমার দ্বারা কোন মানুষের ইলমী-আমলী ও দ্বীনি কোন উপকার হবে। কিন্তু আমি আমার মাঝে আল্লাহর কুদরত দেখেছি। আল্লাহ আমার মতো একজন নগণ্যকে কতইনা ইজ্জত দিয়েছেন এবং কতই না সম্মানে দ্বীনের কাজে লাগিয়েছেন। সব কিছুর জন্য আমার মাওলার বেশুমার শুকরিয়া, আলহামদুলিল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, এমন শিক্ষক বহু পাওয়া যাবে, যারা খুবই চমৎকারভাবে এবং সুন্দর করে গুছিয়ে পড়াতে পারেন। তাঁরা হয়ত ভাবেন, যোগ্যতা নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে পড়াতে পারলেই নিশ্চিত সম্মান পাওয়া যায়। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা হলো, না। মূলত এভাবে সম্মান পাওয়া যায় না। বরং কেউ যদি মাত্র তিনটি ফর্মুলা বাস্তবায়ন করে, তাহলে আল্লাহ তাকে চতুর্মুখী ইজ্জত-সম্মান দিবেন।
- ছাত্রদের হক আদায় করে পড়ানো এবং তাদের তরবিয়ত ও আখলাকের প্রতি শফকতি নজর রাখা।
- মাদসার ও ছাত্রদের মালি খেয়ানত না করা।
- চরিত্রহীন কোন কাজে জড়িয়ে না পড়া; বরং নিজের চরিত্র-আখলাক ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা।
মাত্র এই তিনটি কাজ যদি কোন শিক্ষক যথাযথ করেন, তাহলে আল্লাহ তাকে বিনাসন্দেহে পদে পদে ইজ্জত-সম্মান দান করবেন।
হযরতের আদর্শ, মতাদর্শ ও চিন্তাধারা:
হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী দা. বা. সর্বক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা (ওয়াসাত্বিয়্যাহ), ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। অতিরিক্ত কঠোরতা কিংবা অতি শৈথিল্য এই দুটির কোনোটিই হুজুরের নিকট পছন্দনীয় নয়।
আমার অনুসন্ধান অনুযায়ী হুজুর কখনোই ব্যক্তিস্বার্থের প্রতি আগ্রহী হননি। দুনিয়াবি কোনো উপকারিতা, ব্যক্তিগত সুবিধা বা ক্ষুদ্র অর্জন তাঁর নিকট মূল্যবান নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি দ্বীনি চাহিদাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।
তাঁর জীবন-দর্শনের মূল সুর হলো— “যেখানে দ্বীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেখানেই সঠিক পথ উন্মুক্ত হবে। পক্ষান্তরে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ ও একচেটিয়া চিন্তাভাবনা প্রাধান্য পাবে, সেখানেই বিশৃঙ্খলা, দূরত্ব এবং গোমরাহি সৃষ্টি হবে।” এজন্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ বনাম দ্বীনি অগ্রাধিকারের প্রশ্নে হুজুর সর্বদা দ্বীনি দাবিকেই সর্বোচ্চ স্থান দেন। এ বিষয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থ, “দৃষ্টিভঙ্গির পরিশুদ্ধি” বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এই গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন যে, নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের পিছে পড়া বা নিজ মতাদর্শকে একমাত্র দ্বীন মনে করা উচিত নয়। এমন মানসিকতা কেবল দূরত্ব, বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য বাড়ায়। এর পরিবর্তে, সকলের মধ্যে উদার মনমানসিকতা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নিজের স্বার্থের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও যেন ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে কোনো আঘাত না লাগে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক।
হুজুর সবসময়ই আশা করেন, যেন মুসলমানদের পারস্পরিক মতবিরোধ, সংঘাত বা বিভ্রান্তি দূর হয়ে সবাই যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। তাঁর চিন্তাধারায় ফুটে ওঠে, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যার প্রতিটি অংশই সম্মান, সহমর্মিতা ও ভারসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই দ্বীনি অঙ্গণ বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধিতা করা উচিত নয়। সর্বদা খেয়াল রাখা উচিত যেন আমার কর্ম বা আচরণ দ্বারা ইসলামের কোনো ক্ষতি না হয়, কিংবা আমার আচরণের ফলে ইসলাম সম্পর্কে কেউ যেন নেতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগ না পায়।
একজন ছাত্র হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করি, হুজুরের এই মধ্যমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, পরিশুদ্ধ মানসিকতা এবং ব্যক্তিস্বার্থহীন দ্বীনি নিষ্ঠা আমাদের প্রজন্মের জন্য এক বিরাট শিক্ষণীয় মডেল। তাঁর চিন্তা, রচিত গ্রন্থাবলি, এবং বাস্তবিক জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
ছাত্রদের প্রতি হুজুরের আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা:
হযরত ছাত্রদের প্রতি অসাধারণ আন্তরিক, হৃদয়বান ও কল্যাণকামী। তাঁর আচরণে এমন এক গভীর মমত্ববোধ প্রতিফলিত হয়, যা একজন প্রকৃত মুরব্বির বৈশিষ্ট্যকে পূর্ণরূপে ধারণ করে। ছাত্রদের যেকোনো সুবিধা–অসুবিধা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন, মানসিক অবস্থা কিংবা পড়ালেখার অগ্রগতি—সবকিছুতেই তিনি গভীর মনোযোগ দেন এবং খোঁজ রাখেন।
ছাত্রদের জন্য হুজুরের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে—যেখানে যে কেউ যেকোনো বিষয়ে নির্দ্বিধায় পরামর্শ নিতে পারে। তাঁর কাছে পরামর্শ গ্রহণ করতে বা দুঃখ–বেদনা জানাতে কখনো সংকোচ বোধ হয় না; বরং ছাত্ররা তাঁর স্নেহময় আচরণে স্বস্তি অনুভব করে।
আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা আজও হৃদয়ে অম্লান। আমি যখন প্রথম নানুপুর মাদরাসায় উলূমুল হাদীস পড়ার উদ্দেশ্যে আসি, তখন হুজুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। আমি তাঁর সামনে এখানে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সফর করে এক নতুন পরিবেশে আসলাম বলে নিজের বাথরুম ব্যবহার করতে বললেন। আমি ইতস্তত বোধ করলে তিনি আন্তরিকতার সাথে বললেন ‘কোনো সমস্যা নেই, গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নাও’। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি কাটিয়ে সেখানে গোসল করার পর এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করি—যা আজও মনে পড়লে হৃদয় ভরে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। পুরাতন ছাত্রদের সাথে আবাসিক কক্ষে (সীট রুমে) স্থানান্তরিত হতে যতদিন সময় লেগেছে, সেই পুরোটা সময় তিনি আমাকে নিজ তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। তাঁর সাথে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এবং আমি যেন কোনো ধরনের অস্বস্তি বা একাকীত্ব অনুভব না করি, সেজন্য তাঁর পাশে থাকা কক্ষের ছাত্রদের সাথেও আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। শুরু থেকেই তাঁর এই সদয় ব্যবহার আমার হৃদয়ে এক অটুট শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
মুশরিফ(অমূল্য তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে হযরত:
উলূমুল হাদীস বিভাগে দুই বছরের ছাত্রজীবনে আমি তাঁকে এমন একজন অমূল্য মুশরিফ হিসেবে পেয়েছি, যিনি প্রতিটি ছাত্রের প্রতি সমান দরদ, সমান উৎসাহ ও সমান নজরদারি রাখেন। তিনি নিয়মিত ছাত্রদের পড়াশোনার অবস্থা জানতে চান, দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে আন্তরিকতার সঙ্গে সংশোধনের পথ দেখান এবং তাদের সফলতার জন্য সর্বদা দোয়া ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।
সার্বিকভাবে, আমার দৃষ্টিতে হুজুর এমন একজন মুরব্বি ও শিক্ষক—যিনি ছাত্রদের শুধু শিক্ষাদানই করেন না; বরং তাদের জীবনের দিশা, মানসিক প্রশান্তি এবং দ্বীনি অগ্রগতির জন্য এক অবিচল ছায়া হয়ে থাকেন। তাঁর আন্তরিকতা, মমতা এবং ছাত্র–কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব সত্যিই অনন্য ও অনুকরণীয়।
ওয়াজ, খুতবা, বক্তৃতা ও দাওয়াতি কার্যক্রমে তাঁর অবদান:
ওয়াজ ও দাওয়াতি ময়দানে তিনি হলেন একজন প্রভাবশালী ও হৃদয়গ্রাহী বক্তা। কোরআন-হাদীসনির্ভর বর্ণনা, সাবলীল উপস্থাপনা এবং সমাজসংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলছেন।
জুমা ও ঈদের খুৎবা, মসজিদ-মাদরাসার মাহফিল কিংবা বিভিন্ন ইসলামী অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য মানুষকে নেক আমল, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করছে।
প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ সহ নানামুখী আরও দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে তিনি তরুণসমাজকে আদর্শ জীবনের দিকে আহ্বান করছেন। কুসংস্কার দূরীকরণ ও দ্বীনি শিক্ষার প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁর কথার আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞা মানুষের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হয়েছে।
হযরতের লেখনী ও বক্তৃতার ময়দানে শাইখুল হাদীস আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি.-এর অবদান:
হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী হাফি.-এর জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎকর্ষ, রচনাশৈলী এবং বাগ্মিতার নেপথ্যে তাঁর প্রিয় উস্তাদ ও মুরব্বি, শাইখুল হাদীস আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি.-এর বলিষ্ঠ অভিভাবকত্ব কাজ করেছে। হযরতের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে শাইখুল হাদীস হাফি. একজন বিজ্ঞ কারিগরের ভূমিকা পালন করেছেন। হযরতের অগ্রযাত্রার প্রতিটি ধাপ উস্তাদের সঠিক দিকনির্দেশনায় কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
ক. লিখনশৈলী ও গবেষণার বিকাশ:
ছাত্রজীবন থেকেই হযরতের মধ্যে লেখালেখির আগ্রহ থাকলেও, উলূমুল হাদীস বিভাগে অধ্যয়নকালে আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি.-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তা বিশেষ মাত্রা পায়। উলূমুল হাদীসের “মুশরিফ” হিসেবে শাইখুল হাদীস হাফি. ছাত্রদের নিয়মিত বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক থিসিস লিখতে উদ্বুদ্ধ করতেন। উস্তাদের এই ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা ও নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমেই হযরতের কলম শাণিত হয় এবং তাঁর গবেষণা-প্রতিভা সুশৃঙ্খলভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
খ. খিতাবত ও জুমার মিম্বরে যাত্রা:
খেতাবত বা বক্তৃতার ময়দানে হযরতের যাত্রার শুরুটাও ছিল তাঁর উস্তাদের গভীর আস্থার প্রতিফলন। আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি. যেখানে জুমার নামাজ পড়াতেন, মাঝেমধ্যে বিশেষ ব্যস্ততার কারণে সেখানে তিনি নিজের পরিবর্তে তাঁর প্রিয় শাগরেদ মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদীকে পাঠাতেন। এভাবে বেশ কয়েক সপ্তাহ হযরত উস্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে জুমার নামাজ পড়ান। পরবর্তীতে এই দায়িত্বটি স্থায়ীভাবে তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়। এভাবেই মূলত খিতাবতের ময়দানে হযরতের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। উস্তাদের সেই দোয়া ও আমানতকে সঙ্গী করে হযরত আজও সেখানে অত্যন্ত সুনামের সাথে খিতাবতের খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।
গ. ওয়াজ ও প্রচারের ময়দানে হাতেখড়ি:
জনসমক্ষে বয়ান ও দ্বীনি দাওয়াতের প্রসারেও উস্তাদের ভূমিকা ছিল স্নেহপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক। একবার নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায় একটি বড় মাহফিলে আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি. হযরতকে সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানে বয়ানের মঞ্চে হুজুর কর্তৃপক্ষকে বলেন “আমার নির্ধারিত সময়ের মধ্য থেকে অন্তত দশ মিনিট সময় আপনারা মাওলানা শফিউল্লাহকে দিন।” এটি ছিল মূলত উস্তাদের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য এই ময়দানে কাজ করার এক বিশেষ অনুমতি ও দুয়া। উস্তাদের এই দুয়া ও নেক নজরে সেই সংক্ষিপ্ত বয়ানই উপস্থিত শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। সেই মাহফিলের পর থেকেই মূলত বক্তা হিসেবে তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত হতে থাকে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে বয়ানের আহবান আসতে শুরু করে।
সারকথা: মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী হাফি.-এর বর্তমান পরিচিতি ও বহুমুখী খিদমতের প্রতিটি পর্যায়ে আল্লামা কুতুবুদ্দীন নানুপুরী হাফি.-এর দিকনির্দেশনা ও দোয়া মিশে আছে। মূলত উস্তাদের পরম মমতা ও সঠিক পথপ্রদর্শনই তাঁকে একজন দক্ষ লেখক, বাগ্মী ও গবেষক হিসেবে জনকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী:
হযরতের জীবন এক আদর্শিক গুণাবলির অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য ও সুশৃঙ্খল জীবনবোধের আলোকোজ্জ্বল দিকগুলো এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
ক. ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:
• বিনয় ও তাওয়াজূ:
হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদী হাফি.-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গুণ হলো তাঁর অসাধারণ বিনয় ও নম্রতা। উচ্চ শিক্ষা, গভীর জ্ঞান ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তিনি সর্বদা নিজেকে দ্বীনের একজন নগণ্য খাদেম হিসেবে মনে করেন। তিনি উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সকলের সাথে অত্যন্ত অমায়িক ও সদয় ব্যবহার করেন।
আমি নিজে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি- কোনো সাধারণ অভিভাবক তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সালাম, মুসাফাহা ও মোআনাকা করেন। হযরতের কর্মস্থল জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়ার বাৎসরিক মাহফিলে আগত হাজার মেহমানের আবাসন ও আপ্যায়নের গুরুদায়িত্ব হুজুরের কাঁধে থাকে। কয়েক হাজার মেহমানের সুবিধা-অসুবিধা তিনি নিজে তদারকি করেন এবং ছাত্র-সহযোগীদের সেবার মান রক্ষায় সদা তৎপর রাখেন। মাহফিলে আগত যেসব মেহমান তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান, তিনি সবার জন্যই সময় বের করার চেষ্টা করেন—নিজ কক্ষে বসান, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন। হযরতের অধীনে সহযোগী খাদেম হিসেবে কাজ করার সুবাদে তাঁর এই আতিথেয়তা, বিনয় ও তাওয়াজু‘ খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
• ধৈর্য ও সহনশীলতা:
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অটল থাকা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লজিং জীবনে কখনো কখনো না খেয়ে থাকার মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং কারো কাছে তা প্রকাশ করেননি। এই অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতাই তাঁর চরিত্রের অন্যতম শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান কর্মজীবনেও ছাত্রদের দুর্বলতা ও ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল; মমতার সঙ্গে তাদের সংশোধনের পথ দেখান। তিনি কড়া শাসনের চেয়ে মমতাময়ী সংশোধনে বেশি বিশ্বাসী।
• ক্ষমাশীলতা ও উদারতা:
হযরত অত্যন্ত ক্ষমাশীল স্বভাবের অধিকারী। ছাত্রদের ভুলত্রুটি তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন এবং সংশোধনের সুযোগ করে দেন। কেউ তাঁকে কষ্ট দিলেও তিনি তা অন্তরে পুষে রাখেন না; বরং ক্ষমার মহান আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেন। তাঁর এই গুণ ছাত্রদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাঁকে আরও বেশি শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করে।
আমি যখন উলূমুল হাদীস প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলাম, তখন দ্বিতীয় বর্ষের এক ভাই পারিবারিক কারণে মাদরাসা ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তিনি আর যাননি। একদিন আমি তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তিনি বলেন- আমি বিবাড়িয়া হুজুরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম; হুজুর অত্যন্ত আন্তরিকতা ও মমতার সঙ্গে আমাকে বুঝিয়েছিলেন। হুজুরের সেই টান ও ভালোবাসা আমাকে মাদরাসা ছাড়তে দেয়নি।
• সত্যবাদিতা ও আমানতদারি:
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তাঁর সত্যবাদিতার জন্য উস্তাদদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। আর্থিক লেনদেন ও আমানত রক্ষায় তাঁর সততা প্রবাদতুল্য। তিনি মনে করেন, একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য ছাত্রদের হক আদায়, আমানতদারি এবং উত্তম চরিত্র বজায় রাখা অপরিহার্য।
• দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা:
তিনি অত্যন্ত দূরদর্শী ও বাস্তববাদী। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি নিজ তালীমি মুরব্বির পরামর্শ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গভীর প্রজ্ঞা এবং চিন্তাশীলতার প্রতিফলন।
• সময়ানুবর্তিতা:
হযরতের জীবন ঘড়ির কাঁটার মতো নিয়মে বাঁধা। ছাত্রজীবনে তিনি কখনো অতিরিক্ত ছুটি কাটাননি; এমনকি নিকটাত্মীয়দের বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানেও পাঠদান থেকে বিরত থাকেননি। বর্তমানেও তিনি ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রমের প্রতিটি কাজে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকেন।
• পরিচ্ছন্নতা ও সুশৃঙ্খলতা:
তিনি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, কক্ষ এবং কাজের ধরনের মধ্যে এক রুচিশীল আভিজাত্য ও পরিপাটি ভাব প্রকাশ পায়। তাঁর দরসসমূহ সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত হওয়ার পেছনেও এই শৃঙ্খলাবোধই মূল ভূমিকা রাখে। ছাত্রদের মাঝেও তিনি পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব শিক্ষা দেন।
• অধ্যয়ন ও গবেষণায় নিমগ্নতা:
তিনি একনিষ্ঠ জ্ঞানসাধক। তিনি নিয়মিত হাদীস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যের গবেষণায় মগ্ন থাকেন। ছাত্রজীবনে পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়াশোনার যে অভ্যাস গড়েছিলেন, কিতাব রচনার প্রয়োজনে আজও তিনি গভীর রাত পর্যন্ত অধ্যয়ন ও লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকেন।
• নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগি ও আন্তরিকতা:
তাঁর সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো, আল্লাহর প্রতি গভীর তাওয়াক্কুল ও নিয়মিত ইবাদত। তিনি নিয়মিত সালাত, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তিলাওয়াতে অভ্যস্ত। ছাত্রজীবনে প্রতিদিন সালাতুল হাজত আদায় করে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন— যেন তাঁকে দ্বীনের একজন খাদেম বানানো হয়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি যে মাদরাসায় অবস্থান করতেন, তার জন্য নানাবিধ খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। মাদরাসার জন্য অত্যন্ত আন্তরিকার সাথে দূর-দূরান্তে গিয়ে কালেকশন করতেন। কালেকশনের ক্ষেত্রে শুধু পরিমাণে নয়; বরং কর্মতৎপরতা ও আন্তরিকতার দিক থেকেও সবসময় সবার অগ্রগামী থাকতেন—যার সাক্ষ্য তাঁর উস্তাদগণ আজও দিয়ে থাকেন। এই নিয়মিত ইবাদত, দোয়া এবং মাদরাসার প্রতি আন্তরিকতাই তাঁর জীবনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠে। তিনি ছাত্রদেরও এসব বিষয়ে সচেতন ও উৎসাহিত করেন।
গ. খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা:
• সরল ও সুন্নতি খাদ্যাভ্যাস:
হযরত অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। খাবারের বিলাসিতা বা অপচয় তিনি পছন্দ করেন না। সুন্নতি তরীকা অনুযায়ী তিনি পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ আহার, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং বাকি অংশ খালি রাখার নিয়ম মেনে চলেন।
• স্বাস্থ্য সচেতনতা:
তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহর দেওয়া আমানত এই শরীরের সুস্থতা ছাড়া দ্বীনের খেদমত যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি পর্যাপ্ত পানি পান করেন এবং ছাত্রদেরও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। ফজরের নামাজের পর দোয়া ও তাসবীহ শেষে তিনি দীর্ঘক্ষণ নিয়মিত হাঁটেন।
• শারীরিক পরিশ্রম ও সক্রিয়তা:
তিনি অলসতাকে প্রশ্রয় দেন না। মাদরাসার বিভিন্ন কাজে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেন এবং মাদরাসার জন্য পরিশ্রম করাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে মনে করেন। তাঁর মতে, শারীরিক সক্রিয়তা মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান।
• পরিকল্পিত জীবন:
হযরতের জীবন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও পরিকল্পনাময়। কিতাব রচনার কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে কখনো কখনো তাঁর রাতে শয্যাগমনে কিছুটা বিলম্ব ঘটে; তবে তা সত্ত্বেও তিনি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, জাগ্রত হওয়া ও আহার গ্রহণের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেন। রাত্রিকালীন ইলমি ব্যস্ততা সত্ত্বেও দিনের বাকি সময় তিনি অত্যন্ত সুচারু, সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করে থাকেন।
তাঁর সামাজিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা:
তিনি সমাজ সংস্কার ও সংশোধনের ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে কুসংস্কার দূরীকরণ, যুবসমাজকে নৈতিকতার পথে ফিরিয়ে আনা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-সহায়তায় এবং মানবিক কল্যাণে তাঁর উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসিত।
তিনি বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও মানবিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে সেগুলোর সফল পরিচালনা করছেন। তাঁর উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে যে সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে তার ফিরিস্তি নিম্নে উল্লেখ হলো-
- ফখরে বাঙাল ইসলামিক পাঠাগার।
- আলবাকী ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
- বড়নগর মৌলভীবাড়ী আল্ ইখওয়ান যুব সংঘ।
- বড়নগর উলামা-ত্বলাবা পরিষদ।
- জামিয়া ওবাইদিয়া নুরুল উলূম চাতলপাড়।
- আল-লাবীব প্রকাশনী।
তাঁর নেতৃত্বে এই সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে দাওয়াত, শিক্ষা, সেবা ও নানামুখী কল্যাণমূলক কার্যক্রমে অনন্য ভূমিকা রাখছে। তিনি অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ও সংগঠনের দক্ষতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।
সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তিনি মানুষের সমস্যা সমাধানে, হাজতমন্দের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন।
সারকথা: সমাজ ও সংগঠনগত অঙ্গনে তার অবদান ছিল বিস্ময়কর ও অনন্য। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্ব সমাজকে সঠিক দিশা দেখিয়েছেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছেন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
আধ্যাত্মিক জীবন ও বায়আত:
হযরত ছাত্র জীবন হতেই তাসাউফ ও সুলূকের প্রতি বিশেষ আগ্রহ রাখতেন। তিনি ছাত্র জীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সাধনের লক্ষ্যে হযরত মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী রহ- এর বিশেষ খলিফা হযরতুল আল্লাম মুফতি আবু সাঈদ হাফি.( সিনিয়র মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ, ঢাকা) এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। অতঃপর ছাত্র জীবন শেষ করে কর্মসংস্থানে আসার পর কুতবুল আলম আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী রহ- এর সুযোগ্য সাহেবজাদা ও জানশীন হযরত মাওলানা শাহ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী দা.বা.- এর সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
বর্তমানে তিনি তাঁর এই শায়খের তত্ত্বাবধান ও সার্বিক দিকনির্দেশনায় আত্মশুদ্ধির যাবতীয় আমলের চর্চা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি কারো পক্ষ থেকে খেলাফতপ্রাপ্ত হননি। তবে খেলাফতপ্রাপ্ত দু’একজন পীর ও বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব তাঁকে খেলাফত দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে হযরত খেলাফতের এত বড় জিম্মাদারির যথাযথ হক আদায়ে অক্ষমতা পেশ করে বিনয়ের সাথে এই নূরানী জিম্মাদারি না দেওয়ার অনুরোধ জানান।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি:
বস্তুত আল্লাহ তাআলা যাকে দ্বীনের খেদমতের জন্য কবুল করেন, তাঁর সম্মান-মর্যাদা মানুষের অন্তরে স্থাপন করে দেন। হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমুদী অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও দাওয়াতের প্রতিটি পর্যায়ে যে সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন, তা তাঁর গভীর ইলম, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন। এখানে তাঁর প্রাপ্ত সম্মাননা ও স্বীকৃতির কিছু ধাপ উল্লেখ করা হলো:
১. অধ্যয়নকালীন সম্মাননা ও স্বীকৃতি:
- অধ্যয়নকালেই তিনি তীক্ষ্ণ মেধা ও গভীর মনোযোগের কারণে উস্তাদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
- একাধিক উস্তাদ তাঁর সম্পর্কে সাক্ষ্য দেন যে, তিনি আদব-আখলাকে এবং ইলম বোঝা ও সংরক্ষণে সমসাময়িকদের মধ্যে অনন্য ছিলেন।
- উচ্চতর জামাতে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই তাঁকে জুনিয়র ছাত্রদের দারস তত্ত্বাবধান ও পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি।
২. অধ্যাপনা কালে প্রাপ্ত সম্মাননা:
- অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
- তাঁর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বাস্তবমুখী দারস শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
- প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ও উচ্চতর শ্রেণির পাঠদানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, যা তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি বহন করে।
৩. সনদ, ইজাজত ও একাডেমিক স্বীকৃতি:
কুরআন, হাদীস ও ফিকহে উচ্চতর অধ্যয়ন শেষে তিনি আল্লামা সুলতান যউক নদভী রহ. সহ দেশের প্রখ্যাত উলামায়ে কিরামের নিকট থেকে ইলমী সনদ ও হাদীসের ইজাজত লাভ করেন, যা তাঁর ইলমের গ্রহণযোগ্যতার শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. সামাজিক ও একাডেমিক মহলে স্বীকৃতি:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ইলমি ও দাওয়াতি অঙ্গনে একজন সম্মানিত আলেম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। বিভিন্ন ইলমি মজলিস, সেমিনার ও দাওয়াতি ময়দানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়—যা তাঁর ইলমি অবস্থান ও আস্থার পরিচয় বহন করে।
তবে এসব সম্মাননা ও স্বীকৃতি হযরতের কাছে গর্বের উপকরণ নয়; বরং উম্মাহর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রেরণা। তিনি সর্বদা বিশ্বাস করেন যে, ইলমের মর্যাদা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আর তা সংরক্ষণ হয় ইখলাস ও আমলের মাধ্যমে।
হযরতের স্বরণীয় বাণী ও উক্তি:
তাঁর দীর্ঘ ইলমী ও দাওয়াতি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি প্রায়ই এমন কিছু কথা ও উপদেশ রাখতেন, যা মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটত। প্রত্যেকের জীবনের জন্য দিশারী হয়, তাঁর এমন কিছু অমূল্য উক্তি ও স্মরণীয় বাণী নিম্নে তুলে ধরা হলো-
- সাধনার কাছে অসাধ্য বলতে কিছু নেই।
- মহান দরবারে চোখের পানির পুঁজি লাগাও, লাভের অভাব হবে না।
- তোমার বর্তমান সুন্দর কর, তাহলে তোমার অতিত ও ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়ে যাবে।
- পৃথিবীর সব কিছু তোমার তরে, তুমি কেবল আল্লাহর তরে।
- তোমারা কেবল কভার মার্কা ও মোড়কজাত আলেম হয়ো না; বরং কার্যত ও গুণগত আলেম হও।
- যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে জয়ী হয়, সে-ই প্রকৃত বিজয়ী।
- দুনিয়া হলো নিজের ছায়ার মতো—তাড়া করলে পালায়, ছেড়ে দিলে পিছু নেয়।
- অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া দুর্বলতা নয়; বরং ঈমানের বিশাল শক্তিমত্তা।
- তোমার সৎচরিত্রই হোক অপরের জন্য সবচেয়ে বড় দাওয়াত।
- আমলহীন ইলম বাতির মতো, যে অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজে জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়।
- তুমি দুনিয়ার সবই পাইলা, শুধু আল্লাহকে পাওনি, তবে তুমি কিছুই পাওনি।
- ভুল থেকে শিক্ষা নাও, ভুলের নিচে শুদ্ধ লোকায়ত থাকে।
উপসংহার:
এই বিজ্ঞ আলেমের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর সাফল্যের মূল কারণ ছিল, ইলম অর্জনের প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ-উদ্দীপনা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ইলমের জন্য কষ্ট ও মুজাহাদা করা। নানাবিদ কোরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করা।
এই আলেমের জীবন কোনো ঘটনাবহুল জীবনী নয়; বরং একটি সচেতন সাধনার ইতিহাস। তিনি তাঁর অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার উভয় কালে নিজেকে অত্যন্ত ছোট ও নগণ্য মনে করেতেন, অহংকার মুক্ত রাখতেন। যার ফলে আল্লাহ তাকে দেশবিখ্যাত উচুপায়ের বড় আলেম বানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনন্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যুগের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে কুরআন-সুন্নাহকে মানদণ্ড বানিয়েছেন। এজন্যই তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ সময়ের পরিবর্তনেও যুগ যুগ ধরে জিন্দা হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, এই বিজ্ঞ আলেমের জীবন হলো, ইলম ও আমলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর দর্শন, চিন্তা, চরিত্র ও কর্মধারা আমাদের সকলের জন্য পথনির্দেশক। ব্যক্তিগত জীবনে তাকওয়া এবং সমাজে দ্বীনের খেদমতের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে, ইলম তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা আমলে রূপ নেয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
পরিশিষ্ট-
হযরতের কর্মস্থল ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়
ক. জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি উচ্চমানের শিক্ষা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। এখানে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) এবং ইফতা, উলূমুল হাদীস, তাফসীর, ইসলামী অর্থনীতি, দাওয়াহ ও ক্বিরাত বিভাগসহ উচ্চতর গবেষণার নানাবিধ সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এর ‘উলূমুল হাদীস’ বিভাগটি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও মানসম্পন্ন হাদীস গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
খ. হযরত মাওলানা শফিউল্লাহ মাহমূদীর পদবি ও দায়িত্ব
হযরত বর্তমানে জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন:
- সহকারী প্রধান: উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ (উলূমুল হাদীস)।
- সিনিয়র মুদাররিস ও আদীব: জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর।
হযরতের প্রধান কার্যাবলি:
- শিক্ষাদান: উলূমুল হাদীস ও হাদীস শাস্ত্রের বিভিন্ন জটিল বিষয়ে পাঠদান।
- গবেষণা তত্ত্বাবধান: ছাত্রদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও থিসিসে দিকনির্দেশনা প্রদান।
- সম্পাদনা: এককালীন ম্যাগাজিন ‘আস-সালাহ’, বার্ষিক ডায়েরি ও স্মরণিকা সম্পাদনা এবং পাঠ্যক্রম উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন।
- বিশেষ কোর্স: বার্ষিক পরীক্ষার পরবর্তী ছুটি এবং পবিত্র রমজানুল মোবারকে নাহু-সরফ ও আরবি সাহিত্যের বিশেষ কোর্স পরিচালনা।
- দরসিয়্যাতে পাঠদান: উলূমুল হাদিস বিভাগের মুশরিফ হওয়ার পাশাপাশি তিনি দরসিয়্যাতের বিভিন্ন জামাতে পাঠদান করে থাকেন।
গ. যোগাযোগ ও স্থায়ী ঠিকানা
- প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা: উস্তাযুল হাদীস ওয়াল আদাবিল আরাবী, জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।
- স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বড়নগর (মৌলভীবাড়ি), উপজেলা: নাসিরনগর, জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
- পরিচিতি: মাদরাসায় তিনি ‘বি-বাড়িয়া হুজুর’ এবং ইলমী মহলে ‘শফিউল্লাহ মাহমূদী’ নামে সমধিক পরিচিত।
মন্তব্যসমূহ
মাশাআল্লাহ, হুজুরের ইলম, আমল ও আজীবন খেদমতের জীবন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দ্বীন প্রচার ও তালীম-তারবিয়াতে তাঁর ত্যাগ ও অবদান নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল খেদমতকে কবুল করুন, মর্যাদা আরো বুলন্দ করুন এবং আমাদেরকে তাঁর নেক আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমীন।
আপনার মন্তব্য আমাদের উৎসাহ যোগায়। এভাবেই আমাদের সাথে থাকুন। 🤝
আল্লাহ তাআলার অসংখ্য শুকরিয়া, যিনি আমাকে এমন একজন আল্লাহওয়ালা উস্তাদের ছাত্র হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। এজন্য আমি নিজেকে ধন্য ও সৌভাগ্যবান মনে করি। আল্লাহ তাআলা হুজুরকে হায়াতে তাইয়্যিবা দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁর ইলম ও আমল থেকে বেশি বেশি ইস্তিফাদা হাসিল করার তৌফিক দান করুন—আমিন।
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লাইক ও শেয়ার করে আমাদের অনুপ্রাণিত রাখুন।
আলহামদুলিল্লাহ! আমার ওস্তাদ গনের মাঝে সব দিকে সর্বাগ্রে যে কয়জন ওস্তাদ রয়েছেন,তাদের মাঝে হুজুরও অন্যতম একজন, আল্লাহ তাআলা হুজুরকে কোনদিকে কমতি রাখেনি, আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ দুই বছরে হুজুরের দরস তাদরীস,শাসন, আদর,সবমিলিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত করলাম । এবং এই সময়েই অতিতের সময়ের তুলনায় দীগুন তরাক্কী অর্জন করলাম। আল্লাহ তায়ালা ওস্তাদে মুহতারামের ইলমে আমলে এবং হায়াতে আরো বেশি বারাকাহ দান করুন।আমীন
আল্লামা শফিউল্লাহ মাহমূদী সাহেব আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৌরব, এমন যোগ্য আলেম আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিয়ামত।
আপনার মন্তব্য আমাদের উৎসাহ যোগায়। এভাবেই আমাদের সাথে থাকুন। 🤝
আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করছি যে, তিনি এমন একজন সচেতন ও দায়িত্ববান ছাত্র আমাকে দান করেছেন, যে আমার জীবনের কিছু দিক সুন্দর ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
আমি তার এই প্রচেষ্টাকে নিজের যোগ্যতা নয়; বরং তার হুসনে যন, আন্তরিকতা ও উস্তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখি।
আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম বদলা দান করুন, তার ইলম ও কলমে বরকত দান করুন—আমিন।
হযরত, আপনার এই নেক দুআ এবং উৎসাহ আমাদের জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। আমরা যা লিখেছি তা আপনার বিশাল ব্যক্তিত্বের অতি সামান্য অংশ মাত্র। আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে আপনি গ্রহণ করেছেন তাতে আমরা আল্লাহর দরবারে অনেক কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সুস্থতার সাথে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং আমাদের আপনার ইলমের ছায়ায় ধন্য হওয়ার তাওফীক দিন। আমিন।
দাওরা পড়ে এক বছর আদব পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম দুই বছর ইফতা পড়বো, তখন আমার এক উস্তাদের সাথে পরামর্শ করলে উনি নানুপুর মাদরাসার পরামর্শ দেন এবং বলেন, তুমি নানুপুর মাদরাসায় গিয়ে মাও. শফিউল্লাহ মাহমূদী হুজুরের সাথে স্বাক্ষাৎ করবে, হুজুর তোমাকে ভর্তির যাবতীয় দিক-নির্দেশনা দিবে৷
নানুপুর মাদরাসায় আসলে ভর্তির সময় ও কোটা শেষ হবার পরও হুজুরের সহযোগিতা ও আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই, আলহামদুলিল্লাহ৷
আলহামদুলিল্লাহ দুই বছর ইফতা পড়ার কারণে ইলমের লাইনে অনেক উন্নতি সাধন হয়৷
গত বছর "মাযহাব মানা শিরক নয়" বইটি সংকলন করে হুজুরের কাছে সম্পাদনার আবেদন করলে শত ব্যস্ততার মাঝে হুজুর তা গ্রহণ করেন এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পাদনা করেন৷
আল্লাহ হুজুরের হায়াতে, ইলমে বরকত দান করুন, আমীন৷
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লাইক ও শেয়ার করে আমাদের অনুপ্রাণিত রাখুন।
আলহামদুলিল্লাহ! জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিগুলোর একটি হলো—এমন একজন আল্লাহওয়ালা উস্তাদের ছাত্র হওয়া। আল্লাহ তাআলা হুজুরের নেক হায়াত বাড়িয়ে দিন এবং আমাদেরকে তাঁর কাছ থেকে ইলম ও হিকমাহ গ্রহণ করে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এভাবে নিয়মিত লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আমাদের সঙ্গেই থাকুন। 😊
আলহামদুলিল্লাহ ,নিজেকে ধন্য মনে করতেছি,এত বড় একজন আল্লাহওয়ালা দ্বীনদারের ছাত্র হওয়ার আল্লাহতালা তৌফিক দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা হুজুরের নেক হায়াত বাড়িয়ে দিক। এবং আমাদেরকে হুজুর থেকে আরও বহুৎ ফায়দা হাসিল করার তৌফিক দান করুক। আমীন
আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এভাবে নিয়মিত লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আমাদের সঙ্গেই থাকুন। 😊